আল-জাজিরায় সংবাদ প্রকাশ: নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ বাড়ছে

বেশ কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশ ইস্যুতে সরব কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম 'আল-জাজিরা'। আজ সোমবারের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
আল-জাজিরায় সংবাদ প্রকাশ: নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ বাড়ছে
প্রকাশিত

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে নতুন করে ভয় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় এই আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। যদিও সরকার বলছে, এসব ঘটনার অধিকাংশই সাধারণ অপরাধ, ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত নয়।

রাজশাহী শহরের একজন হিন্দু শিক্ষক সুকুমার প্রামাণিক বলছেন, এবারের নির্বাচন হয়তো রাজনীতির ওপর তাঁর বিশ্বাসের শেষ পরীক্ষা।

“নির্বাচন এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে সংখ্যালঘুরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনকালীন সময়ে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সময়ে সংখ্যালঘুরা প্রায়ই সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আগস্টের পর বদলে যাওয়া বাস্তবতা

২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র আকার নেয়। বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠে। তবে সরকার বরাবরের মতোই দাবি করছে, এসব হামলার পেছনে ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না।

সুকুমার প্রামাণিক জানান, রাজশাহীর বিদ্যাধরপুর গ্রামে তাঁর নিজ পরিচিত লোকজনই একদিন তাঁর ওপর হামলা চালায়।

“আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে চিনে, আঘাত করবে না। কিন্তু তারা আমার হাত ভেঙে দিয়েছে। শুধু হাত নয়, ভেঙে দিয়েছে বিশ্বাস,” বলেন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে অস্ত্রোপচারসহ কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়।

‘ন্যায়বিচার হয়নি কখনোই’

বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের (বিএইচবিসিইউসি) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন কোনো একক সরকারের সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না।

“২০০১ সালের নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর যে হামলা হয়েছিল, তার বিচার হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতেও হয়নি। বিচার না হওয়াটাই সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে,” বলেন তিনি।

ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে কমপক্ষে ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৬১ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার অপসারণের পর ওই বছরেই ২ হাজার ১৮৪টি ঘটনার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।

“এখন সংখ্যালঘুরা গভীরভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে,” বলেন নাথ।

সরকারের ভিন্ন ব্যাখ্যা

সরকারি হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। সরকারের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে জড়িত ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টিতে ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ ছিল। বাকি ঘটনাগুলোকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারের যুক্তি, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ সহিংস অপরাধে নিহত হন। ফলে প্রতিটি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করা সঠিক নয়।

এছাড়া, হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতীয় গণমাধ্যম ও কিছু রাজনৈতিক মহলের মাধ্যমে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলেও সরকারের দাবি।

তবে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০২৫ সালে তারা ২২১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যেখানে একজন নিহত ও অন্তত ১৭ জন আহত হন।

‘আরেকটা মানসিক আঘাত সহ্য করতে পারবো না’

রাজশাহীর বিদ্যাধরপুর গ্রামের গৃহিণী শেফালি সরকার এখনো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। ওই দিন শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।

“সেদিন মনে হয়েছিল আমরা বাঁচবো না। পুরুষরা পালিয়ে গিয়েছিল। আমরা নারীরা ঘরে ছিলাম,” বলেন তিনি।

হামলার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শেফালি। চিকিৎসাও নিতে হয়েছে।

“নির্বাচন এলেই ভয়টা আবার ফিরে আসে। আরেকটা মানসিক আঘাত আমি সহ্য করতে পারবো না,” বলেন তিনি।

তাঁর স্বামী নারায়ণ সরকার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও ভয় থেকেই যায়।

“শান্তি কখন কেড়ে নেওয়া হবে, কেউ জানে না,” বলেন তিনি।

সব জায়গায় একই চিত্র নয়

তবে সব এলাকাতেই যে আতঙ্ক সমান- তা নয়। ফরিদপুরের দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সম্পাদক শ্যামল কর্মকার বলেন, তাঁদের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।

“আমাদের এখানে কোনো হামলা হয়নি। আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করছি,” বলেন তিনি।

বিএনপি নেতা তারেক রহমান ইতোমধ্যে সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তার কথা বলেছেন। জামায়াতে ইসলামীও প্রথমবারের মতো খুলনায় একজন হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।

তবু শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জে, যেখানে ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হিন্দু, উদ্বেগ রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ প্রামাণিক বলেন, “এই নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, এই ভয়টা থেকেই যাচ্ছে।”

আশ্বাস বনাম বাস্তবতা

ঐক্য পরিষদের নেতা মণীন্দ্র নাথ অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসেনি।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

“আমাদের লক্ষ্য- সবাই যেন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারে,” বলেন তিনি।

তবে রাজশাহীর সুকুমার প্রামাণিক এখনো দ্বিধায়।

“যদি আবার হামলা হয়,” তিনি বলেন, “তাহলে রাজনীতির ওপর আমার বিশ্বাস এটাই শেষ।”

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com