বাংলাদেশে বড় প্রশ্ন: খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কি বহন করতে পারবেন তাঁর ছেলে তারেক রহমান?

কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম , ‘আল-জাজিরা’র একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই প্রশ্ন। বিস্তারিত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
বাংলাদেশে বড় প্রশ্ন: খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কি বহন করতে পারবেন তাঁর ছেলে তারেক রহমান?
প্রকাশিত

খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে।

 তবে প্রশ্ন হলো- এটি কি তাঁর পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন কোনো যুগের সূচনা করবে?

মঙ্গলবার ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জাতির শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে। হাসপাতাল থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সেই সংবাদ, বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই।

গত ২৩ নভেম্বর রাত থেকে খালেদা জিয়া এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালের ফটকের সামনে ভিড় করেন দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছতে দেখা যায় অনেককে।

বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন,

“এই খবর শোনার পর ঘরে থাকা সম্ভব হয়নি। তাঁকে দেখার সুযোগ নেই, তাই সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। সবার চোখে জল।”

বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত খালেদা জিয়ার জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লক্ষাধিক বিএনপি সমর্থকের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকরা। এই উপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব কেবল দলীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।

তবে শোকের আবহের বাইরে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকবদল।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুখে দলটি এমন এক সময়ে প্রচারণায় নামছে, যখন তাদের সবচেয়ে বড় ঐক্যের প্রতীক আর নেই। দীর্ঘ অসুস্থতা ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরও খালেদা জিয়া ছিলেন দলের চূড়ান্ত রেফারেন্স পয়েন্ট।

তাঁর মৃত্যু বিএনপিকে পুরোপুরি ‘উত্তর-খালেদা যুগে’ প্রবেশ করিয়েছে। ফলে দলের নেতৃত্ব ও দায়বদ্ধতার সব ভার এখন কার্যত তাঁর পুত্র ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর এসে পড়েছে। একই সঙ্গে দলটি জুলাই ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে পথ খুঁজছে।

প্রতীকী উপস্থিতি থেকে শূন্যতার পরীক্ষা

দশকের পর দশক ধরে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব কেবল সাংগঠনিক পদে সীমাবদ্ধ ছিল না। সামনে না থেকেও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক অভিভাবক ও শেষ সিদ্ধান্তের কেন্দ্র। তাঁর উপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঠেকাতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদি আমিন আল জাজিরাকে বলেন,

“বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারাল।”

তিনি খালেদা জিয়াকে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও নীতির আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

মাহদি আমিনের ভাষায়,

“তাঁর রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র-আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।”

তিনি দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে এসব প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিএনপি পুনরুদ্ধার করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, তারেক রহমান ইতোমধ্যে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার সক্ষমতা দেখিয়েছেন। শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন সমন্বয় এবং ভোটাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন,

“খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলকে দীর্ঘদিন চাঙ্গা ও ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। সেই ছন্দ এখন ব্যাহত হবে।”

তারেক রহমানকে এখন নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে, এটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আসবে। তাঁর নেতৃত্ব এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, খালেদা জিয়াও একসময় অপ্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তাঁর উত্থান ঘটে, যা সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনে ভূমিকা রাখে। ১৯৮১ সালে তাঁর স্বামী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।

মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেক রহমানের জন্যও তেমনই একটি নির্ধারক মুহূর্ত হতে পারে। জয় এলে তাঁর নেতৃত্ব বৈধতা পাবে, আর ব্যর্থতা বাড়াবে প্রশ্ন ও সমালোচনা।

আরও কঠিন নির্বাচনী মাঠ

বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চরিত্র বদলে যাওয়ায়।

প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবদ্ধ ছিল। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর এই কাঠামো গড়ে ওঠে এবং ৯০ ও ২০০০-এর দশকে আরও দৃঢ় হয়।

কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় সেই দ্বিদলীয় আধিপত্য ভেঙে গেছে। ফলে বিএনপিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে আরও বিস্তৃত ও জটিল রাজনৈতিক মাঠে। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী জোট, যেখানে জুলাই ২০২৪-এর গণআন্দোলনের তরুণ নেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও রয়েছে।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন,

“এটা বিএনপির জন্য সহজ হবে না। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে।”

নির্বাচন সময়মতো হবে কি না, শান্তিপূর্ণ হবে কি না এবং ভোটের প্রতি জনআস্থা নিশ্চিত করা যাবে কি না—এসব অনিশ্চয়তাও বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নয়, পুরো দেশের জন্যই একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক স্থিতিশীল প্রবীণ কণ্ঠের শূন্যতা তৈরি করেছে।

তিনি জানান, তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো, যেগুলো ২০০৬-২০০৯ সালের সেনাসমর্থিত সরকার ও পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হয়েছিল, বন্ধ হওয়ার পরই এই প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়।

দিলারা চৌধুরীর মতে, তারেকের দেশে ফেরা দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের আশঙ্কা কমিয়েছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাঁর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, কর্তৃত্ববাদ প্রত্যাখ্যান এবং ২০২৪ সালের জুলাই সহিংসতার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা দলীয় কর্মীদের আশ্বস্ত করেছে।

“বিএনপি ও আওয়ামী লীগ- দুটো দলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক,” তিনি বলেন। “খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানের সেই জায়গায় আসাটা স্বাভাবিক।”

উত্তরাধিকার নয়, রায় হবে মাঠে

তবে বিএনপি নেতারাও স্বীকার করছেন- উত্তরাধিকারই শেষ কথা নয়।

দলের কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এখনও সামনে আসছে। মাহদি আমিন এসব অভিযোগ অনেকটাই অতিরঞ্জিত বলে দাবি করলেও বলেন, দল অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করবে।

তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরাও বলছেন, নেতৃত্ব বদল সহজ হবে না।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন বলেন,

“চ্যালেঞ্জ থাকবে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অতীতেও খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধ ছিল। তবে আমার বিশ্বাস, তারেক রহমান তা সামাল দিতে পারবেন।”

কামাল উদ্দিন কক্সবাজার থেকে তিন সহকর্মীসহ খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন।

তবে দলের শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় উড়িয়ে দিয়েছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,

“তার নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। তিনি দল পরিচালনায় সক্ষম।”

বিশ্লেষকদের মতে, শৃঙ্খলা রক্ষা, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করাই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন বিতর্কও দেখা দিয়েছে।

২৯ নভেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তারেক রহমান লেখেন, দেশে ফেরা “পুরোপুরি তাঁর একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়”। সমালোচকরা এটিকে ভারতের মতো কোনো বাহ্যিক প্রভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন।

বিএনপি এসব দাবি নাকচ করে জানায়, তারেকের প্রত্যাবর্তন ছিল পুরোপুরি আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল, কোনো বিদেশি সমঝোতার নয়।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতি অনেকের কাছে ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে।

কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় তারেক রহমানের সংবর্ধনা সমাবেশে আসা ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়া বলেন,

“১৯৭৯ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম। ধানখেতে কাজ করার সময় জিয়াউর রহমান এসে আমার হাত ধরেছিলেন। সেই দিন থেকেই আমি বিএনপির মানুষ।”

তিনি স্মরণ করেন, জিয়াউর রহমান খাল খনন করে খরা মোকাবিলা করেছেন, গ্রামে গ্রামে গেছেন খালি পায়ে, প্রোটোকল ছাড়াই।

দুলাল মিয়ার ভাষায়,

“তারেক রহমানকে তাঁর বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার বহন করতেই হবে। না পারলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিএনপি মানুষের রাজনীতি—এটা শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান, বহন করেছেন খালেদা জিয়া। আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানও তা পারবেন। না পারলে মানুষই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে।”

আরো পড়ুন

No stories found.
logo
The Metro TV | দ্য মেট্রো টিভি | The Metro TV Bangladesh | Bangla News Today | themetrotv.com |The Metro TV News
themetrotv.com