

পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, ‘পার্বত্য রাঙ্গামাটি’ আসনের সংসদ সদস্য, দীপেন দেওয়ান।
বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’- এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, ‘ভিন্নমতে সহমত’- এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে বাংলাদেশের একটি অনন্য অঞ্চল। এখানে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে। এই সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করেই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দীপেন দেওয়ান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব। বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় এবং যথাযথ তদারকির ঘাটতি রয়েছে। ফলে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ ও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল সবসময় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে জবাবদিহিতা ও সমন্বিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নকে কেবল সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রচারণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংসদ সদস্য বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চাহিদা খুবই মৌলিক। কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন চায়, কেউ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন চায়, আবার কেউ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন চায়। এসব প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শান্তিপূর্ণ ও সুশাসনভিত্তিক একটি সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ সম্প্রসারণ ছাড়া তাদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নের মূলধারায় এসব জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে সামগ্রিক উন্নয়নও অর্থবহ হবে না। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায় সুপেয় পানির সংকট, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দারিদ্র্যকে অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন দীপেন দেওয়ান। তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই সাংসদ বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ জুম চাষ, ফলমূল, বাঁশ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উৎপাদকদের জন্য কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম শক্তি এবং এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ উন্নয়নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ঈদ, বিজু কিংবা অন্যান্য উৎসব, সব ধরনের উৎসবই এ অঞ্চলের মানুষ সম্মিলিতভাবে উদযাপন করে। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেই উন্নয়ন ও শান্তির পথ এগিয়ে নিতে হবে।