শিক্ষা খাতে অনন্য অবদান জাহেদী ফাউন্ডেশনের
বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক অবহেলা, প্রতিবন্ধকতা ও সুযোগের অভাব, সব মিলিয়ে বহু শিশু আজও মানসম্মত শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল দান-খয়রাত নয়, বরং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজ বদলের চেষ্টা করছে।
তেমনই একটি নাম- ‘জাহেদী ফাউন্ডেশন’।
ঝিনাইদহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (Education Development Programme- EDP) বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করছে, শিক্ষা যদি মানবিক মূল্যবোধে ভিত্তিশীল হয়, তবে সেটিই পারে একটি সমাজিক পরিবেশ বদলে দিতে।
শিক্ষার দর্শন: বইয়ের বাইরের শিক্ষা
জাহেদী ফাউন্ডেশনের শিক্ষা কার্যক্রমের দর্শন খুব স্পষ্ট-
“শিক্ষা কেবল সিলেবাস শেষ করার নাম নয়; শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া।”
এই দর্শনের আলোকে ফাউন্ডেশন এমন একটি শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে-
সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা ভয় নয়, ভরসা পায়
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা অবহেলার বদলে সুযোগ পায়
শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে সমাজে দাঁড়াতে শেখে
জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, আশ্রয়স্থল
মুসা মিয়া বুদ্ধি বিকাশ বিদ্যালয়: বিশেষ শিশুদের জন্য আলাদা পৃথিবী
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষা এখনো আমাদের সমাজে অবহেলিত একটি বিষয়। সেই শূন্যতা পূরণে জাহেদী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে মুসা মিয়া বুদ্ধি বিকাশ বিদ্যালয়।
এখানে প্রতিবন্ধকতা কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; বরং প্রতিটি শিশুর সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করা হয়। প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহায়ক শিক্ষা পদ্ধতি ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ, সব মিলিয়ে এই বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে বিশেষ শিশুদের জন্য এক নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন।
এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে, যা প্রমাণ করে- সুযোগ পেলে তারাও পারে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে।
জাবেদা খাতুন একাডেমি: শিক্ষার প্রথম সিঁড়ি
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শৈশবেই। সেই বিশ্বাস থেকে পরিচালিত হচ্ছে জাবেদা খাতুন একাডেমি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের শেখায়-
✔️ পড়াশোনার আনন্দ
✔️ শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা
✔️ মানবিক আচরণ
এখানে শিক্ষা মানে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা মানে জীবনকে বুঝে নেওয়া।
নুরুন্নাহার জিন্নাতুল কলেজিয়েট স্কুল: মূলধারার প্রস্তুতি
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত নুরুন্নাহার জিন্নাতুল কলেজিয়েট স্কুল জাহেদী ফাউন্ডেশনের শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি এখানে সহশিক্ষা কার্যক্রম, নেতৃত্ব বিকাশ ও সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল সার্টিফিকেটধারী নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
স্কলারশিপ ও সহায়ক শিক্ষা: সুযোগের সমতা
জাহেদী ফাউন্ডেশন জানে, শুধু স্কুল থাকলেই শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। তাই দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু রয়েছে স্কলারশিপ ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম।
পাশাপাশি আইসিটি শিক্ষা, ভাষা উন্নয়ন ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিকে করেছে আরও বাস্তবমুখী।
সমাজে প্রভাব: নীরব কিন্তু দৃশ্যমান পরিবর্তন
জাহেদী ফাউন্ডেশনের শিক্ষা কার্যক্রমের প্রভাব কেবল শিক্ষার্থী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়।
✔️ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে
✔️ পরিবারগুলো শিক্ষা বিষয়ে সচেতন হচ্ছে
✔️ বিশেষ শিশুদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে
এই পরিবর্তন হয়তো শিরোনাম হয় না, কিন্তু সমাজের ভিত শক্ত করে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা: শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করা
ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতে-
নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আধুনিক থেরাপি সুবিধা
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ
এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
শিক্ষা দিয়ে সমাজ গড়ার নিরব সংগ্রাম
জাহেদী ফাউন্ডেশনের শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রম কোনো কর্পোরেট প্রচারণা নয়, কোনো হঠাৎ নেওয়া প্রকল্পও নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, মানবিক ও দায়িত্বশীল সামাজিক উদ্যোগ।
আজ যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে পণ্যে পরিণত হচ্ছে, তখন জাহেদী ফাউন্ডেশন মনে করিয়ে দেয়-
শিক্ষা এখনো মানবিক অধিকার, আর সেই অধিকার বাস্তবায়নই তাদের লড়াই।

