

নভেম্বর ও ডিসেম্বর, এই দু’মাসে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি কেবল সাময়িক পরিসংখ্যানগত ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা একাধিক কাঠামোগত চাপের প্রতিফলন। উৎসব মৌসুম, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, আমদানি নির্ভরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আবারও সাধারণ মানুষের জীবনব্যবস্থায় সরাসরি আঘাত হেনেছে।
গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল, নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে।
এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ওঠানামার মধ্যে আছে। তবে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই ঘোরাফেরা করছে।
বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। টানা তিন মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
নভেম্বর-ডিসেম্বর মানেই শীতকাল, উৎসব ও সামাজিক আয়োজনের সময়। খাদ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। কিন্তু সেই চাহিদা মেটানোর মতো সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয়নি। পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে।
এই সময়টাতে মূল্যস্ফীতির বড় অংশই এসেছে খাদ্যপণ্য থেকে চাল, ডাল, সবজি, ডিম, মাছ ও মাংস।
শীতকালীন সবজির দাম নামার কথা। মাঠপর্যায়ে উৎপাদক দাম কম পেলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার প্রতিফলন হয়নি।
ডিম ও মুরগির বাজারে কার্টেল আচরণ এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে দাম স্থিতিশীল রাখা হয়নি।
ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে টেনে তুলেছে।
বাংলাদেশের বাজার এখনও আমদানিনির্ভর, বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ডাল, গম, চিনি ও জ্বালানি।
ডলারের উচ্চমূল্য ও এলসি খোলার জটিলতায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা সরাসরি ভোক্তা মূল্যে যুক্ত হয়েছে।
এখানে সমস্যা শুধু ডলার নয়, আস্থার সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তাও বাজারকে অস্থির করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বাড়িয়েছে, তারল্য সংকুচিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-
সুদের চাপ পড়ছে উৎপাদন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর
অথচ বাজারে পণ্যের দাম তাতে খুব একটা কমছে না
কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতি চাহিদা-নিয়ন্ত্রিত নয়, বরং সরবরাহ ও ব্যয়-নির্ভর (cost-push inflation)।
সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ এবং কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা না থাকায়-
সিন্ডিকেট শক্তিশালী হচ্ছে
পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান বাড়ছে
সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে
মূল্যস্ফীতি এখানে আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি শাসন ও ব্যবস্থাপনার সংকটের প্রশ্ন।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার
নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী
গ্রাম থেকে শহরে আসা শ্রমজীবী মানুষ
আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে, ফলে সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ বাড়ছে, জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাচ্ছে।
নভেম্বর-ডিসেম্বরের মূল্যস্ফীতি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে,
নীতিনির্ধারণে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আস্থার পুনর্গঠন একসঙ্গে দরকার।
না হলে মূল্যস্ফীতি সাময়িক কমলেও মানুষের জীবনের চাপ কমবে না।
এই মূল্যস্ফীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি অর্থনীতির গভীরে থাকা অসামঞ্জস্যের প্রকাশ। প্রশ্ন এখন একটাই-
নীতিনির্ধারকরা কি এটাকে সংখ্যার সমস্যা হিসেবে দেখবেন, নাকি মানুষের জীবনের সংকট হিসেবে নেবেন?