রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত দেশের অন্যতম পরিচিত এবং কনিষ্ঠতম জেলা নারায়ণগঞ্জ। ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ নামে পরিচিত এ জেলা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী-বন্দরকে ধারণ করে। তবে উল্লেখ্য যে, শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে ছোট জেলা। রাজধানী ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দুটি বিমান ঘাঁটির জ্বালানী সরবরাহও এ জেলা থেকেই হয়ে থাকে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বহু সমৃদ্ধ। এই জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী, এ কে এম শামীম ওসমান, জ্যোতি বসুসহ অনেক গুণী ও কৃতি ব্যক্তি।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৬৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা বিকন লাল পান্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে এ অঞ্চলের মালিকানা গ্রহণ করেন। তিনি তার প্রভু লক্ষী নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত একটি বাজারকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে এই স্থান নারায়ণগঞ্জ নামে পরিচিতি লাভ করে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলার মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জ নামে কোনো শহরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
সোনারগাঁ এবং নারায়ণগঞ্জের বিকাশ
মুসলিম শাসনের অধীনে সোনারগাঁ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। তবে চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজনৈতিক কারণে সোনারগাঁয়ের গুরুত্ব কমে গেলেও এটি বন্দর ও টাঁকশাল শহর হিসেবে রয়ে যায়। চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এটি স্বাধীন রাজ্যের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু ১৬১১ সালে ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খানের পতনের পর সোনারগাঁয়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়।
ইংরেজ শাসন ও আধুনিক নারায়ণগঞ্জ
ইংরেজ শাসনামলে নারায়ণগঞ্জ বিশ্ববাজারে পাট, লবণ ও বিভিন্ন ধরনের মসলার জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করে। তখনকার দিনে শীতলক্ষা নদীর পশ্চিম তীরে বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং একের পর এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জকে ৪.৫ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সে সময় রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে যাতায়াতের প্রধান পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর। এজন্য একে ‘বাংলার প্রবেশদ্বার’ বলা হতো। পরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ করতে ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন সার্ভিস চালু হয়, যা তখনকার শিল্প-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৮২ সালে নারায়ণগঞ্জকে মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়। ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়।
ভূগোল ও পরিবেশ
নারায়ণগঞ্জ জেলা শীতলক্ষা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী দ্বারা বেষ্টিত। এটি পাললিক মাটি দ্বারা গঠিত সমতলভূমি। প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে নারায়ণগঞ্জের বুকে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলার প্রাচীন রাজধানী পানাম নগর। মোঘল আমলে নির্মিত কিছু প্রাসাদ ও স্থাপত্য আজও অতীতের গৌরবময় দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে আছে।
দর্শনীয় স্থান
নারায়ণগঞ্জের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো:
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর
ঐতিহ্যবাহী পানাম নগর
হাজীগঞ্জ জলদুর্গ
সোনাকান্দা দুর্গ
বাংলার তাজমহল
বিবি মরিয়ম মসজিদ ও সমাধি
কদমরসুল দরগা
বারদী লোকনাথ আশ্রম
সারা বছর পর্যটকদের আনাগোনায় এসব স্থান মুখরিত থাকে। সহজ ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন।
অর্থনীতি ও শিল্প
নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জেলা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, এখানে মোট ২,৪০৯টি শিল্প ইউনিট রয়েছে, যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের মূল ব্যবসাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
খাদ্য ও পানীয়
তামাক
পাট ও তুলা শিল্প
বস্ত্র ও চামড়া শিল্প
কাঠ ও কাগজ পণ্য
রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন
জেলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার কৃষি কাজে নিয়োজিত। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তার সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়ছে।
নারায়ণগঞ্জের জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক বিভাজন
নারায়ণগঞ্জ জেলার আয়তন ৭৫৯.৫৪ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এ জেলা ৫টি উপজেলা ও ৭টি থানায় বিভক্ত।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২৫টি আঞ্চলিক পত্রিকা রয়েছে, যা জেলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত তুলে ধরে।
শিল্প, বাণিজ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। প্রাচীন বাংলার গৌরবদীপ্ত এই অঞ্চল আধুনিকতায়ও এগিয়ে চলেছে। বন্দর নগরী হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির একটি কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।