রাষ্ট্র সংস্কার- শুনতে নৈতিক, প্রয়োজনীয় এবং সময়োপযোগী। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দটি যতটা নিরপেক্ষ মনে হয়, রাজনীতির ভেতরে তা ততটাই বিতর্কিত। বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ নিয়ে আলোচনা বাড়ে সাধারণত রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন-পূর্ব অচলাবস্থা বা আন্তর্জাতিক চাপের সময়। প্রশ্ন তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে- রাষ্ট্র সংস্কার আসলে কার এজেন্ডা, এবং এর মাধ্যমে কার স্বার্থ সুরক্ষিত বা পুনর্গঠিত হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারকে স্লোগান হিসেবে নয়, ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে বুঝতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার সাধারণত বোঝায়-
প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি
জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
আইন ও প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা
ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন
কিন্তু বাস্তবে সংস্কার কখনোই শূন্যে ঘটে না। এটি হয় বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে, এবং প্রায়শই সেই কাঠামোকেই পুনর্বিন্যাস করার প্রয়াস হিসেবে।
ফলে সংস্কার প্রশ্নটি হয়ে ওঠে, কি সংস্কার হবে, কে করবে, আর কার ওপর প্রভাব পড়বে?
ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্র সংস্কার অনেক সময়-
প্রশাসনকে আরও অনুগত করার প্রক্রিয়া
আইনকে শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ
বিরোধী রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সংস্কার মানে ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, বরং ক্ষমতার দক্ষ ব্যবস্থাপনা। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, কিন্তু সেই শক্তি নিচের দিকে নয়, ওপরের দিকে প্রবাহিত হয়।
বিরোধী শক্তির কাছে রাষ্ট্র সংস্কার প্রায়শই একটি ট্রানজিশনাল এজেন্ডা-
নিরপেক্ষ প্রশাসন
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ
কিন্তু ক্ষমতায় পৌঁছানোর পর এই সংস্কার এজেন্ডা অনেক সময় গুরুত্ব হারায়। ফলে সংস্কার এখানে আদর্শ নয়, বরং ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত পক্ষ হলো ডেমোক্রেসি।
প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার মানে-
ক্ষমতা ও সুবিধার পুনর্বণ্টন
জবাবদিহির আওতা বাড়ানো
স্বাভাবিকভাবেই ডেমোক্রেসির একটি অংশ সংস্কারকে দেখে নিজেদের প্রভাব ক্ষয়ের ঝুঁকি হিসেবে। ফলে তারা সংস্কারকে ধীর করে, পুনর্ব্যাখ্যা করে বা কাগুজে রূপে সীমাবদ্ধ রাখে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো গুরুত্বপূর্ণ-
নির্বাচন
মানবাধিকার
সুশাসন
আর্থিক স্বচ্ছতা
এই সংস্কার এজেন্ডা অনেক সময় বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে, আবার কখনো কখনো তা ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন হয়। সংস্কার তখন জাতীয় চাহিদার চেয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বেশি গুরুত্ব পায়।
নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে ধারাবাহিক কণ্ঠ। তারা কথা বলেন-
আইনের শাসন
প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা হলো-
মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক শক্তির অভাব
গণভিত্তিক চাপ তৈরি করতে না পারা
ফলে সংস্কার আলোচনা থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে প্রভাব সীমিত।
বাংলাদেশের মূল সমস্যা অনেক সময় কাঠামোগত নয়, সংস্কৃতিগত-
ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতি
আনুগত্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান
আইনের চেয়ে সম্পর্কের প্রাধান্য
এই সংস্কৃতি বদলানো ছাড়া কেবল আইন বা কাঠামো সংস্কার টেকসই হয় না। কিন্তু সংস্কৃতি বদলানো মানে দীর্ঘমেয়াদি, ধীর ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়া, যা রাজনৈতিকভাবে কম আকর্ষণীয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ নির্বাচন ব্যবস্থা।
কারণ এখানেই ক্ষমতার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত।
কার অধীনে নির্বাচন
প্রশাসনের ভূমিকা
ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা
এই জায়গায় সংস্কার মানে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া, যা কোনো ক্ষমতাসীন শক্তির জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার প্রায়ই-
সংকটকেন্দ্রিক
সময়সীমাবদ্ধ
ক্ষমতা পরিবর্তনমুখী
দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের জন্য যে রাজনৈতিক ঐকমত্য, ধৈর্য ও আত্মসংযম দরকার, তা অনুপস্থিত।
সত্যটি কঠিন কিন্তু স্পষ্ট-
আংশিকভাবে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে
আংশিকভাবে বিরোধীদের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজনে
আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য
আর সীমিতভাবে নাগরিকদের প্রকৃত স্বার্থে
এই বৈপরীত্যই রাষ্ট্র সংস্কারকে জটিল ও বিতর্কিত করে তোলে।
রাষ্ট্র সংস্কার রাজনীতির বাইরে নয়; বরং এটি রাজনীতিরই পরিণত রূপ।
বিষয় হলো- এই রাজনীতি কি ক্ষমতা পুনর্বণ্টনের সাহস রাখে, নাকি শুধু ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার নতুন কৌশল তৈরি করে?
বাংলাদেশে টেকসই রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব তখনই, যখন এটি কোনো একক গোষ্ঠীর এজেন্ডা না হয়ে সমষ্টিগত রাজনৈতিক চুক্তিতে রূপ নেয়। যেখানে ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক প্রত্যাশার মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি হয়।
রাষ্ট্র সংস্কার তাই কোনো একদিনের ঘোষণা নয়; এটি একটি দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য কিন্তু অনিবার্য রাজনৈতিক যাত্রা।
প্রশ্ন শুধু- এই যাত্রা কে নিয়ন্ত্রণ করবে, আর এর গন্তব্য কাদের জন্য উন্মুক্ত হবে?