ঢাকা এখন আর শুধু জনবহুল একটি মহানগর নয়; ঢাকা ক্রমশ একটি পরিবেশগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠছে।
বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে থাকা খবর আমাদের মাঝে মাঝে চমকে দিলেও বাস্তবতা আরও গভীর- এই শহরে শুধু বাতাস নয়, পানিও দূষিত, শব্দও দূষিত। অর্থাৎ ঢাকার নাগরিকেরা শ্বাস নেয় দূষিত বাতাসে, পান করে দূষিত পানি, আর দিন-রাত বাস করে এক অবিরাম শব্দের কারাগারে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি একটি সমন্বিত নগর পরিবেশ বিপর্যয়।
ঢাকার বায়ুদূষণ আজ আর মৌসুমি ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল। ইটভাটা, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পকারখানা, পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, নির্মাণকাজের ধুলো এবং নগর পরিকল্পনার অভাব, সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাসে বিপজ্জনক মাত্রায় PM2.5 ও PM10 জমে থাকে।
এই দূষণ শুধু শ্বাসকষ্ট নয়, সৃষ্টি করছে-
হৃদরোগ
স্ট্রোক
ফুসফুস ক্যানসার
শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা
ঢাকায় বসবাস মানেই আজ আয়ু ও সুস্থতার সঙ্গে নীরব আপস।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু আজ কার্যত বর্জ্য বহনকারী নালা। শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের মিশ্রণে এই পানি শুধু ব্যবহারের অযোগ্যই নয়, অনেক ক্ষেত্রে জীবনের জন্য বিষাক্ত।
ভূগর্ভস্থ পানিও নিরাপদ নয়। অতিরিক্ত উত্তোলন ও দূষণের ফলে-
আর্সেনিক
ভারী ধাতু
ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণ
নগরবাসীর পানীয় জলে ঢুকে পড়ছে। অথচ পানি দূষণ নিয়ে জনআলোচনা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম।
ঢাকায় শব্দদূষণ যেন স্বাভাবিকতা পেয়েছে। হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইক, যানজট, সব মিলিয়ে শব্দমাত্রা প্রায়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়।
এর প্রভাব-
শ্রবণশক্তি হ্রাস
অনিদ্রা
উচ্চ রক্তচাপ
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
সমস্যা শুধু দূষণে নয়, সমস্যা হলো-
সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অভাব
আইন থাকলেও প্রয়োগের ঘাটতি
পরিবেশকে “উন্নয়নের শত্রু” ভাবার মানসিকতা
স্বল্পমেয়াদি লাভকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার ওপরে স্থান দেওয়া
ঢাকার দূষণ আসলে নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো- আমরা ধীরে ধীরে দূষণের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছি। মাস্ক পরা, ফিল্টার বসানো, শব্দ এড়িয়ে চলা, এসব ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠছে স্বাভাবিক।
কিন্তু এটি সমাধান নয়; এটি আত্মসমর্পণ।
একটি শহর তার নাগরিকদের ব্যক্তিগত সমাধানের ওপর ছেড়ে দিতে পারে না।
সমাধান একদিনে আসবে না, কিন্তু দিকনির্দেশনা স্পষ্ট-
ইটভাটা ও শিল্পকারখানার কঠোর নিয়ন্ত্রণ
গণপরিবহন ও সবুজ পরিবহনে বিনিয়োগ
নদী দখল ও শিল্পবর্জ্যের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
শব্দদূষণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ
নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা।
ঢাকা এখন আর শুধু একটি শহর নয়;
এটি একটি পরীক্ষা, আমরা কি উন্নয়ন চাই, নাকি টিকে থাকার অধিকারও রক্ষা করতে চাই?
“বাতাস, পানি আর শব্দ” এই তিনটি যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই মানুষের জীবনকে অর্থবহ করতে পারে না।
ঢাকার দূষণ আসলে আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি একটি প্রশ্ন- আমরা কি এখনও শুনছি?