বাংলাদেশে জন্ম, বাংলাদেশেই বসবাস, তবু জীবন গেল অন্য দেশের যুদ্ধের গুলিতে। টেকনাফের ৯ বছর বয়সী শিশু হুজাইফা সুলতানার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ বাস্তবতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
১১ জানুয়ারি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয় হুজাইফা। টানা ২৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু ঘটে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা সেই গুলি কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়নি, পেয়েছে একটি শিশুর শরীর।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি রাখাইন রাজ্যের চলমান সশস্ত্র সংঘাতের ধারাবাহিক প্রভাব, যা ক্রমেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার কার্যত একটি স্থায়ী গৃহযুদ্ধের দেশে পরিণত হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা। ভারী অস্ত্রের ব্যবহার, মর্টার শেল ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এক ধরনের খোলা যুদ্ধক্ষেত্র।
ভৌগোলিক বাস্তবতা হলো, রাখাইন রাজ্য বাংলাদেশের টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঠিক পাশেই। ফলে যুদ্ধের গোলা, গুলি কিংবা বিস্ফোরণ সীমান্তরেখাকে মানছে না। কখনো শব্দ এসে পৌঁছায়, কখনো শেল পড়ে, কখনো আবার হুজাইফার মতো মৃত্যু ঘটে।
টেকনাফের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাস মানে প্রতিদিন অদৃশ্য এক যুদ্ধের মধ্যে থাকা। শিশুরা খেলাধুলা করে, মানুষ কাজ করে—কিন্তু বুকের ভেতর থাকে স্থায়ী আতঙ্ক।
স্থানীয়দের ভাষায়, গুলির শব্দ এখন আর বিরল নয়। অনেকে সন্তানদের ঘরের বাইরে যেতে দিতে ভয় পান। শিক্ষা, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
হুজাইফার মৃত্যু সেই ভয়কে বাস্তব রূপ দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে, সীমান্তবাসীদের জন্য যুদ্ধ আর দূরের কিছু নয়।
বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ওপর বাংলাদেশের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
আন্তর্জাতিক আইনে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে নাগরিক নিহত হওয়া গুরুতর অপরাধ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় ডুবে থাকা মিয়ানমারের কাছ থেকে দায় স্বীকার বা প্রতিকার আদায় সহজ নয়।
ফলে সীমান্তবাসী রয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থানে, রাষ্ট্রীয় আশ্বাস আর বাস্তব ঝুঁকির মাঝখানে।
হুজাইফার মৃত্যু একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়- যুদ্ধ সীমান্তে থামে না। যদি রাখাইনের সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল কার্যত একটি ‘ফরওয়ার্ড ফ্রন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিটি মৃত্যুর পর শুধু শোক প্রকাশ করেই থেমে যাব, নাকি এই ঘটনাগুলোকে সামনে রেখে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্ত অবস্থান নেব?
হুজাইফা আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু উপেক্ষিত হলে, পরের নামটি বদলাবে, বাস্তবতা একই থাকবে।
একটি শিশু তার নিজের দেশে থেকেও নিরাপদ নয়, এই সত্য কতটা ভয়াবহ, তা হুজাইফার মৃত্যুই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাতে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশের টেকনাফে একটি শিশুর মৃত্যু কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির গভীর ব্যর্থতার ফল।
আমরা প্রায়ই বলি, রাখাইনের যুদ্ধ আমাদের সমস্যা নয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যখন সেই যুদ্ধের গুলি সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের নাগরিককে হত্যা করে, তখন তা আর বাইরের সমস্যা থাকে না,
তা সরাসরি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
প্রশ্ন হলো, আমরা বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?
কূটনৈতিক প্রতিবাদ জরুরি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। সীমান্তবাসীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক ফোরামে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি এবং এই ইস্যুকে মানবাধিকার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা, এসব ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে- আমরা কি সীমান্তবাসীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে মেনে নিচ্ছি? যদি না নিই, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের উদ্যোগ কোথায়?
হুজাইফার মৃত্যু আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুদ্ধ কেবল সৈন্যদের মারে না, কূটনীতির ব্যর্থতা শিশুদেরও মারে।
এই আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলে চলবে না।