দেশ

পশ্চিমা চাপ বনাম আঞ্চলিক বাস্তবতা: ঢাকার কূটনৈতিক দোলাচল

ভূরাজনীতি, সার্বভৌমত্ব ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির কঠিন ভারসাম্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আজ একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।

একদিকে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনকেন্দ্রিক চাপ। অন্যদিকে রয়েছে আঞ্চলিক বাস্তবতা- ভারত, চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা। এই দুই বলয়ের টানাপোড়েনে ঢাকা আজ এক ধরনের কূটনৈতিক দোলাচলের মধ্য দিয়ে হাঁটছে, যেখানে ভুল পা পড়লে কৌশলগত ক্ষতি অনিবার্য।

এই দোলাচল কোনো সাময়িক কূটনৈতিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর্শনের পরীক্ষা।

পশ্চিমা চাপ: মূল্যবোধের ভাষা নাকি কৌশলগত হাতিয়ার?

পশ্চিমা বিশ্বের চাপ সাধারণত তিনটি ভাষায় প্রকাশ পায়-

  • গণতন্ত্র ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন

  • মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

  • আইনের শাসন ও জবাবদিহি

এই ভাষা নৈতিক ও নীতিগত হলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি প্রায়ই কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চাপ কখনো ভিসানীতি, কখনো বিবৃতি, কখনো কূটনৈতিক সতর্কবার্তার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

পশ্চিমা দৃষ্টিতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বড় শ্রমবাজার, কৌশলগত সমুদ্রপথের কাছাকাছি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর অংশীদার হতে পারে।

আঞ্চলিক বাস্তবতা: নির্ভরতার জটিল জাল

বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাস্তবতা অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও বাস্তব-

ভারত

নিরাপত্তা, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আঞ্চলিক প্রাধান্য ঢাকার কূটনৈতিক হিসাবকে সীমিত করে।

চীন

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের ভূমিকা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সম্পর্ক শিথিল করা বাস্তবসম্মত নয়।

রাশিয়া

জ্বালানি ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ঢাকার জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়।

এই আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, এখানে আদর্শের চেয়ে বাস্তবতার ওজন বেশি।

ঢাকার কূটনৈতিক দোলাচল: কেন এড়ানো যাচ্ছে না

এই দোলাচলের তিনটি মূল কারণ-

বহুমুখী নির্ভরতা

বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে এক পক্ষকে খুশি করতে গিয়ে অন্য পক্ষকে অসন্তুষ্ট করা ঝুঁকিপূর্ণ।

ভূরাজনৈতিক অবস্থান

বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে পরাশক্তির প্রতিযোগিতা তীব্র। নিরপেক্ষতা তাই নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি সক্রিয় ভারসাম্য।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা

পশ্চিমা চাপ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ককে উসকে দেয়, যা সরকারকে আরও সতর্ক করে তোলে।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: চাপ ও সম্মতির সীমারেখা

পশ্চিমা চাপের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো- সার্বভৌমত্ব। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে বাইরের পরামর্শ নিতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের অধিকার ছাড়তে পারে না।

অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরতা সার্বভৌমত্বকে নীরবে সংকুচিত করতে পারে। এই দুইয়ের মাঝখানে ভারসাম্য না থাকলে রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার অবস্থান

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঢাকার কূটনৈতিক দোলাচলকে আরও জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে দেখলেও বাংলাদেশ চায় অর্থনীতি ও সংযোগের জায়গায় থাকতে।

ঢাকার কৌশল এখন পর্যন্ত স্পষ্ট-

  • সামরিক জোটে নয়

  • অর্থনৈতিক সহযোগিতায় আগ্রহ

  • কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়

এই অবস্থান যুক্তিসংগত হলেও তা বজায় রাখা কঠিন।

কূটনৈতিক ভাষা: অস্পষ্টতা না সচেতন কৌশল?

অনেকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিকে দ্ব্যর্থক বা অস্পষ্ট বলে সমালোচনা করেন। বাস্তবে এটি অনেকাংশে সচেতন কৌশল। স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া মানে এক পক্ষকে হারানো।

এই অস্পষ্টতা ঢাকাকে দরকষাকষির জায়গা দেয়, যদিও এতে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও ওঠে।

ঝুঁকি: দোলাচল যদি দিকহীনতায় রূপ নেয়

এই কূটনৈতিক দোলাচলের ঝুঁকিগুলো গভীর-

  • পশ্চিমা বাজার ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব

  • উন্নয়ন সহযোগিতায় অনিশ্চয়তা

  • আঞ্চলিক শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব

  • অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি

দোলাচল কৌশল হতে পারে, কিন্তু দিকহীনতা নয়।

উত্তরণের পথ: বাস্তববাদী ও স্বচ্ছ পররাষ্ট্রনীতি

বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো-

  • মূল্যবোধ ও স্বার্থের সমন্বয়- একটিকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো নয়

  • বহুপাক্ষিক কূটনীতি- একক শক্তির বদলে জোট ও সংস্থাকে ব্যবহার

  • অভ্যন্তরীণ সংস্কার- যাতে বাইরের চাপ কমে

  • পরিষ্কার যোগাযোগ- ঢাকার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কমানো

পররাষ্ট্রনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য।

পশ্চিমা চাপ ও আঞ্চলিক বাস্তবতার মাঝে ঢাকার কূটনৈতিক দোলাচল অনিবার্য।

কিন্তু এটি দুর্বলতার নয়, বরং জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। প্রশ্ন হলো, এই দোলাচল কি সচেতন ভারসাম্য, নাকি ধীরে ধীরে দিকহীনতার দিকে যাত্রা?

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর- ঢাকা কি কেবল চাপ সামলাবে, নাকি নিজস্ব কৌশলগত দর্শন নিয়ে পরাশক্তির টেবিলে বসবে। ইতিহাসে টিকে থাকে তারাই, যারা দোলাচলের মাঝেও নিজেদের কেন্দ্র হারায় না।