অর্থনীতি

এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের ব্যবসা: কোন খাত লাভবান, কোন খাত চাপে?

সাজ্জাতুজ জামান সুজন

স্বল্পোন্নত দেশের (Least Developed Country-LDC) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। স্বাধীনতার পর দারিদ্র্য, খাদ্যঘাটতি ও বৈদেশিক সহায়তানির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটিকে উন্নয়নশীল অর্থনীতির কাতারে দেখছে। এটি শুধু একটি প্রতীকী স্বীকৃতি নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তবে এই অর্জনের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও যুক্ত। এতদিন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করেছে, গ্রাজুয়েশনের পর তার বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে কমে যাবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কি নতুন প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত? কোন খাত লাভবান হবে, আর কোন খাত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে?

এলডিসি সুবিধা আসলে কী ছিল?

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

* উন্নত দেশগুলোর বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্পশুল্কে প্রবেশাধিকার

* সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা ও ঋণ

* বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) কিছু নিয়মে ছাড়

* রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার

* প্রযুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহায়তা

বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য দীর্ঘদিন শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পেয়েছে, যা রপ্তানি প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।

রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির সামনে নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্যিক বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে রপ্তানি খাতে।

এখন পর্যন্ত অনেক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। গ্রাজুয়েশনের পর ধীরে ধীরে এসব সুবিধা কমে গেলে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।

এর অর্থ হলো-

* উৎপাদন ব্যয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে

* মান ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে

* নতুন বাজার খুঁজতে হবে

* মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়বে

সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে যে খাত: তৈরি পোশাক শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প।

চাপের কারণ-

* ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক সুবিধা কমার সম্ভাবনা

* প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্য ব্যবধান কমে যাওয়া

* ক্রেতাদের মান ও পরিবেশগত মানদণ্ডের চাপ বৃদ্ধি

* শ্রম অধিকার ও টেকসই উৎপাদন নিয়ে বাড়তি নজরদারি

বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারে।

তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু কম শ্রমমূল্যের কারণে বড় হয়নি। বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘদিনের অবস্থানও এই খাতের শক্তি।

প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে যে খাত: ফার্মাসিউটিক্যালস

বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে অনেক বিশ্লেষক LDC-পরবর্তী অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখছেন।

বর্তমান শক্তি-

* দেশের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ

* আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন

* ক্রমবর্ধমান রপ্তানি

* তুলনামূলক উচ্চ মূল্য সংযোজন

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন কিছু ওষুধের পেটেন্ট সংক্রান্ত ছাড় পেয়েছে। গ্রাজুয়েশনের পর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব নীতির কঠোর প্রয়োগ এই খাতকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করতে পারে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য: সম্ভাবনা আছে, কিন্তু প্রস্তুতি কতটা?

চামড়া খাতকে দীর্ঘদিন ধরে পোশাকের বিকল্প রপ্তানি খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সুযোগ-

* কাঁচামালের স্থানীয় প্রাপ্যতা

* আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা

* মূল্য সংযোজনের সুযোগ

তবে সমস্যা-

* পরিবেশগত মানদণ্ড

* বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

* আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের দুর্বলতা

* প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা

এলডিসি-পরবর্তী বিশ্বে শুধু উৎপাদন নয়, টেকসই উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আইটি ও ডিজিটাল সেবা: নতুন যুগের রপ্তানি সম্ভাবনা

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল সেবানির্ভর হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র-

* সফটওয়্যার উন্নয়ন

* তথ্যপ্রযুক্তি সেবা

* বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (BPO)

* ফ্রিল্যান্সিং

* কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা

এই খাতের বড় সুবিধা হলো-

* শুল্কনির্ভর নয়

* ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কম

* উচ্চ মূল্য সংযোজন সম্ভব

* তরুণ জনশক্তিকে কাজে লাগানো যায়

ফলে এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর ডিজিটাল সেবা বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস হতে পারে।

কৃষি ও কৃষিভিত্তিক রপ্তানি: অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কৃষিপ্রধান দেশ হলেও কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এখনও সীমিত।

সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র-

* প্রক্রিয়াজাত খাদ্য

* হিমায়িত মাছ

* চিংড়ি

* ফল ও সবজি

* অর্গানিক পণ্য

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন-

* খাদ্য নিরাপত্তা মান

* কোল্ড চেইন অবকাঠামো

* আধুনিক প্যাকেজিং

* ব্র্যান্ডিং

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: শুল্ক নয়, প্রতিযোগিতা

অনেকেই মনে করেন এলডিসি গ্রাজুয়েশনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে শুল্ক।

বাস্তবে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগিতা।

ভবিষ্যতের বিশ্ববাজারে সফল হতে হলে প্রয়োজন-

* উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি

* দক্ষ মানবসম্পদ

* প্রযুক্তি ব্যবহার

* দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা

* মান নিয়ন্ত্রণ

* উদ্ভাবন 

কারণ, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু কম দাম নয়, নির্ভরযোগ্যতা ও গুণগত মানও বিবেচনা করছে।

ভিয়েতনাম কেন বারবার আলোচনায় আসে?

এলডিসি না হয়েও ভিয়েতনাম বিশ্ববাজারে দ্রুত এগিয়েছে।

কারণ-

* বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

* দক্ষ অবকাঠামো

* দ্রুত বন্দরসেবা

* বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ

* প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- শুধু শুল্ক সুবিধা নয়, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাই দীর্ঘমেয়াদে সফলতার ভিত্তি।

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নতুন সুযোগ

এলডিসি গ্রাজুয়েশন অনেক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর কাছে ইতিবাচক বার্তাও দিতে পারে।

কারণ-

* অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত

* বড় ভোক্তা বাজার

* তরুণ শ্রমশক্তি

* শিল্পায়নের সম্ভাবনা

তবে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে-

* নীতিগত স্থিতিশীলতা

* সহজ ব্যবসা পরিবেশ

* জ্বালানি নিরাপত্তা

* আইনি সুরক্ষা

নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কতটা প্রস্তুত?

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।

কারণ-

* অর্থায়ন সংকট

* প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা

* রপ্তানি বাজারে প্রবেশের বাধা

* আন্তর্জাতিক মান পূরণের খরচ

ফলে এই খাতের জন্য আলাদা নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হবে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় করণীয়

* নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন

* রপ্তানি বহুমুখীকরণ

* বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন

* দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি

* শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা

* বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা

* অপ্রচলিত রপ্তানি খাতকে উৎসাহ দেওয়া

বাংলাদেশের ব্যবসা কি প্রস্তুত?

এ প্রশ্নের উত্তর একক নয়।

ইতিবাচক দিক-

* শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি

* বড় শ্রমশক্তি

* ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন

* ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার

দুর্বলতা-

* অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

* উচ্চ ব্যবসা ব্যয়

* দক্ষতার ঘাটতি

* রপ্তানির অতিরিক্ত একমুখিতা

এলডিসি গ্রাজুয়েশন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে অর্জন এবং পরীক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে দেশটি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। কিন্তু এই নতুন অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

আগামী দিনের বিশ্ববাজারে টিকে থাকার মূল শর্ত হবে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো। তৈরি পোশাক শিল্প কিছু চাপের মুখে পড়লেও ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক পণ্য এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশকে সুবিধানির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রতিযোগিতানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে হবে। আর সেই রূপান্তর কতটা সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দশকে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ।