অর্থনীতি

১.৬ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তের ঋণ অনুমোদন দিল সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১.৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার, যার মধ্যে ১.৬ বিলিয়ন ডলারই 'নন-কনসেশনাল' (অনমনীয়) ঋণ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই অর্থের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে রাখা হবে, যা জরুরি আর্থিক চাপ মোকাবেলায় ব্যবহার করা হবে।

গতকাল (২৮ এপ্রিল) শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় তুলনামূলক কঠিন শর্তের এসব ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সভায় উপস্থিত সূত্র জানায়, বাজেট সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে—এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার।

কর্মকর্তারা জানান, এসব ঋণে সুদের হার বেশি, গ্রেস পিরিয়ড কম এবং পরিশোধের সময়সীমা তুলনামূলক দ্রুত—যা কনসেশনাল ঋণের চেয়ে কঠিন।

'স্ট্রেংদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, সাবপ্রোগ্রাম-২' শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় এডিবি মোট ৭৫০ মিলিয়ন ডলার দেবে, যার মধ্যে ৩০০ মিলিয়ন ডলার কনসেশনাল ঋণ এবং ৪৫০ মিলিয়ন ডলার তাদের অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্সেস (ওসিআর) থেকে দেওয়া হবে।

কনসেশনাল অংশে সুদের হার ২ শতাংশ, পরিশোধকাল ২৫ বছর এবং ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে।

৪৫০ মিলিয়ন ডলারের ওসিআর ঋণটি অনমনীয় হিসেবে বিবেচিত। এসওএফআর + লেন্ডিং স্প্রেড + ম্যাচুরিটি প্রিমিয়াম হিসেবে এতে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ০.৫ শতাংশ, যা চলতি বছরের ২০ এপ্রিলের ৩.৬৩ শতাংশ এসওএফআর হার বিবেচনায় মোট ৪.১৩ শতাংশ দাঁড়ায়।

এছাড়া অব্যবহৃত অর্থের ওপর ০.১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে।

এই ঋণের মেয়াদ ১৫ বছর, যার মধ্যে ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ড। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর গ্রান্ট এলিমেন্ট ৬.৬১ শতাংশ, যা এটিকে অত্যন্ত অনমনীয় ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল এডিবির সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে এটি বোর্ড অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

তাৎক্ষণিক রাজস্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার জাইকার কাছ থেকে আরও ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে। প্রস্তাবিত ঋণে সুদের হার ৩.০৫ শতাংশ (ইঙ্গিতমূলক), পরিশোধকাল ৩০ বছর এবং ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সুপারিশ অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

এডিবির সঙ্গে সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে এআইআইবি ২৫০ মিলিয়ন ডলার দেবে। এ ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে এসওএফআর + ১.৪৫ শতাংশ, যা একই হারের ভিত্তিতে প্রায় ৫.০৮ শতাংশে দাঁড়ায়।

ঋণের মেয়াদ ৩৫ বছর, যার মধ্যে ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে এবং ০.২৫ শতাংশ ফ্রন্ট-এন্ড ফি প্রযোজ্য। ইআরডির বিশ্লেষণে গ্রান্ট এলিমেন্ট ঋণাত্মক ০.৬৮ শতাংশ পাওয়া গেছে, যা এটিকে অত্যন্ত কঠিন ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

সরকার ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট থেকে সমপরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮৫.৩ মিলিয়ন ইউরো) ঋণ নিচ্ছে। এতে সুদের হার ৬ মাসের ইউরিবর + ১.২০ শতাংশ, যা মোট প্রায় ৩.৬১৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

ঋণের মেয়াদ ১৮ বছর, যার মধ্যে ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে এবং ০.২৫ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি প্রযোজ্য। এর গ্রান্ট এলিমেন্ট ১১.৩৮ শতাংশ, যা এটিকেও অনমনীয় ঋণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।

বাজেট সহায়তার বাইরে, কমিটি সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক বিনিয়োগ (ট্রাঞ্চ-২) প্রকল্পের জন্য এডিবির ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পৃথক ঋণও অনুমোদন দিয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা (কাঁচপুর) থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ২১০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন থাকবে।

এর লক্ষ্য হলো ঢাকা-সিলেট রুটকে এশিয়ান হাইওয়ে, সাসেক এবং বিমসটেক করিডোরসহ আঞ্চলিক পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬,৯১৮.৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৩,৬৭৪ কোটি টাকা এবং এডিবি দেবে ১৩,২৪৪.৬৮ কোটি টাকা।

সড়ক প্রকল্পের এই ঋণ এডিবির ওসিআর থেকে আসবে, যার কার্যকর সুদের হার প্রায় ৪.২৩ শতাংশ; পরিশোধকাল ২৫ বছর এবং ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে।

কর্মকর্তারা জানান, ব্যয়বহুল বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে কমিটি বেশ কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেখানে কনসেশনাল ঋণ পাওয়া সম্ভব নয় বা বাস্তবসম্মত নয়, সেখানেই অনমনীয় ঋণ অনুমোদন করা হবে। সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি পাওয়া ঋণগ্রহীতাদের নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দেখাতে হবে।

এছাড়া, অতিরিক্ত শর্তযুক্ত বা বাধ্যতামূলক ডাউন পেমেন্টযুক্ত ঋণ নিরুৎসাহিত করা হবে।

কমিটি আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের বার্ষিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা সরকারি রাজস্বের ১৫ শতাংশ—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম, তার নিচে রাখতে হবে। একইসঙ্গে মোট অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০ শতাংশের নিচে রাখতে হবে।

ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে, ঝুঁকি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।