সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের মুদ্রাবাজারে একধরনের স্বস্তির বার্তা শোনা যাচ্ছে, ডলারের দাম আর আগের মতো প্রতিদিন লাফাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি ডলার স্থিতিশীল হয়, তবে কেন বাজারে অস্থিরতা কাটছে না? কেন নিত্যপণ্যের দাম কমছে না, কেন ব্যবসায় অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে?
এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাজারের প্রকৃত ক্ষমতার মানচিত্র, কে স্থিতিশীলতা থেকে লাভবান হচ্ছে, আর কে চাপ বহন করছে।
ডলারের স্থিতিশীলতা মূলত নামমাত্র (nominal)। অর্থাৎ সরকারি বা ব্যাংকিং চ্যানেলে একটি নির্ধারিত রেট ধরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে ডলারের প্রাপ্যতা, লেনদেনের সময় ও শর্ত, এসব এখনো অস্থির।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার পাওয়া- না পাওয়ার পার্থক্য, এলসি খোলায় অঘোষিত সীমা এবং আমদানিকারকের জন্য বাড়তি শর্ত, সব মিলিয়ে ডলারের বাজার এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
ডলারের একটি অফিসিয়াল বা ব্যাংক রেট আছে, আবার একটি কার্যকর বাজার মূল্যও আছে, যেটি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বাস্তবে বিবেচনায় নেন। এই দ্বৈত বাস্তবতা বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
যারা ডলার সহজে পাচ্ছেন- বিশেষ করে বড় ও প্রভাবশালী আমদানিকারকরা, তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য আনতে পারছেন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি খরচে বা বিলম্বে ডলার পেয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
ডলার স্থিতিশীল হলেও বাজারে দামের নিচে নামার জন্য যে আস্থার প্রয়োজন, তা তৈরি হয়নি।
কারণ-
ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে আগের উচ্চ দামের ভিত্তিতেই মূল্য নির্ধারণ করছেন
আমদানির খরচ একবার বাড়লে তা সহজে কমে না
সরবরাহ শৃঙ্খলের মাঝখানে যারা মজুত ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তারা দামের পতন ঠেকিয়ে রাখছে
ফলে ডলারের স্থিতিশীলতার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিচ্ছে তিনটি গোষ্ঠী-
প্রথমত, বড় আমদানিকারক ও ট্রেডিং হাউসগুলো। তারা আগের বেশি দামে আমদানি করা পণ্য বর্তমান বাজারে ছাড়ছে, অথচ নতুন আমদানিতে তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরের নির্বাচিত গ্রাহকগোষ্ঠী। ডলার বরাদ্দে অগ্রাধিকার পেয়ে তারা বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করছে।
তৃতীয়ত, মজুতদার ও পাইকারি পর্যায়ের নিয়ন্ত্রকরা। তারা বাজারে সরবরাহের গতি নিয়ন্ত্রণ করে দাম স্থিতিশীল নয়, বরং উঁচু রাখছে।
ডলারের স্থিতিশীলতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি আনেনি। তারা এখনও উচ্চ ব্যয়, এলসি জটিলতা ও অনিশ্চিত সরবরাহে ভুগছেন। ভোক্তার ক্ষেত্রে সমস্যা আরও স্পষ্ট- আয় বাড়েনি, কিন্তু দাম কমেনি।
এই ব্যবধান বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
মুদ্রানীতি, বাণিজ্যনীতি ও বাজার তদারকির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এই অস্থিরতার বড় কারণ। একদিকে ডলার স্থিতিশীল রাখতে কড়াকড়ি, অন্যদিকে বাজারে দামের লাগাম নেই। ফলে স্থিতিশীলতা কাগজে থাকছে, বাস্তবে নয়।
ডলার স্থিতিশীলতার সুফল বাজারে পৌঁছাতে হলে-
ডলার বরাদ্দে স্বচ্ছতা
এলসি ও আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ
বাজারে মজুত ও সরবরাহ তদারকি জোরদার
ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সমান সুযোগ
এগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
ডলার স্থিতিশীলতা একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট নয়। যখন এই স্থিতিশীলতা বাজারে সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না, তখন তা কিছু গোষ্ঠীর সুবিধায় পরিণত হয়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ থাকে চাপে।
প্রশ্ন তাই শুধু ডলার কত টাকায় আছে, এই নয়
প্রশ্ন হলো, এই স্থিতিশীলতার লাভ কার হাতে যাচ্ছে। এই প্রশ্নের জবাব না পাওয়া পর্যন্ত বাজারের অস্থিরতা কাটবে না।