বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতির সবচেয়ে চাপের জায়গাগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, এলসি খোলায় কড়াকড়ি এবং শুল্ক-নীতিগত নানা পদক্ষেপের ফলে আমদানি পরিসংখ্যানগতভাবে কমেছে। তবু বাণিজ্য ঘাটতির ভারসাম্য প্রত্যাশিতভাবে ফিরছে না। প্রশ্ন উঠছে, আমদানি কমালে যেখানে ঘাটতি কমার কথা, সেখানে কেন বাস্তবে চাপ থেকেই যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল আমদানি নয়, রপ্তানি কাঠামো, বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও মুদ্রানীতির সমন্বিত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে হয়।
আমদানি কমার তথ্য অনেক সময় বিভ্রান্তিকর। কারণ, আমদানি কমেছে মূলত কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের ইনপুটে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ও উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল হয়।
অর্থাৎ আমদানি কমানো ঘাটতির কারণ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যৎ ঘাটতির বীজ বপন করে।
বাণিজ্য ভারসাম্যের মূল ভিত্তি রপ্তানি। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা চাহিদা কমার ফলে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে অর্ডার কমেছে বা দরকষাকষি কঠিন হয়েছে।
ফলে আমদানি কমলেও রপ্তানি আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না, এটাই ভারসাম্য না ফেরার অন্যতম কারণ।
টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানির পরিমাণ কমলেও ব্যয় কমছে না। কম পরিমাণ পণ্য আমদানি করেও বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির প্রকৃত চাপ থেকে যাচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিনিময় হার সমন্বয় রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কথা থাকলেও, উৎপাদন কাঠামো দুর্বল হলে তার সুফল সীমিত থাকে।
এলসি খোলায় কড়াকড়ি করার ফলে আমদানি হঠাৎ কমেছে, কিন্তু এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটেছে। শিল্পখাতে কাঁচামাল সংকট তৈরি হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে রপ্তানি আয় কমিয়েছে।
এভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নিজেই ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
বাণিজ্য ঘাটতি শুধু পণ্যে নয়, সেবাতেও বাড়ছে। বিদেশে শিক্ষা, চিকিৎসা, সফটওয়্যার সেবা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এখনো নেতিবাচক।
এই ‘অদৃশ্য’ ঘাটতি পণ্যের আমদানি কমিয়েও সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
রেমিট্যান্স বাড়লেও তা বাণিজ্য ঘাটতির পূর্ণ সমাধান নয়। কারণ, এটি চলতি হিসাবের একটি অংশ মাত্র। যখন পণ্যের ঘাটতি বড় হয়, তখন রেমিট্যান্স কেবল চাপ কমায়, ভারসাম্য ফেরায় না।
একদিকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি সংকোচনের মাধ্যমে বৈদেশিক চাপ কমাতে চায়, অন্যদিকে অর্থনীতি সচল রাখতে চায়। এই দ্বৈত লক্ষ্য নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ফলে আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত অনেক সময় উৎপাদন ও রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে আমদানি কমানো একমাত্র পথ নয়। প্রয়োজন-
রপ্তানি বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন
শিল্পের কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানিতে অগ্রাধিকার
সেবা খাত থেকে বৈদেশিক আয় বাড়ানো
বিনিময় হার, শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির সমন্বয়
আমদানি কমানো দিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে বাণিজ্য ভারসাম্য ফেরে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ মূলত রপ্তানি সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন দুর্বলতা ও নীতিগত সমন্বয়হীনতার ফল।
ভারসাম্য তখনই আসবে, যখন আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা ও উৎপাদন কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। না হলে আমদানি কমিয়েও বাণিজ্য ঘাটতির চাপ থেকে মুক্তি মিলবে না।