অর্থনীতি

পোশাক খাতে জ্বালানি-অর্থায়ন সংকট, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন বাঞ্ছনীয়: বিজিএমইএ সভাপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’- এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, ‘ভিন্নমতে সহমত’- এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের শিল্প ব্যবস্থাপনা নানা দিকসমূহ আলোচনা করেছেন, বিজিএমইএ সভাপতি এবং রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বাবু।

দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন এই শিল্পপতি। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, এই শিল্প শুধু রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস নয়, বরং দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি।

বাবু জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ কাজ করছেন, যা গড়ে তিন সদস্যের পরিবার হিসেবে বিবেচনা করলে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতা দেশের বেকারত্ব হ্রাস এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় পোশাক খাতের অবদানকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁর মতে, একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সার্থকতা শুধু মুনাফা অর্জন নয়, বরং মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা এবং একটি টেকসই ব্যবসায়িক ভিত্তি গড়ে তোলা।

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি সংকটকে তিনি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখেন, যা উৎপাদন ব্যাহত করে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ব্যবসার গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দক্ষ জনশক্তির অভাবও একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি শিল্পমুখী নয়, ফলে নতুন কর্মীদের কাজে লাগানোর আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয়, উভয়ই বাড়ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা থাকাও রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন। উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বিকল্প নেই। একইসঙ্গে বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একক বাজার বা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যেতে পারে, তাই এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।

উদ্যোক্তার সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ তৈরি করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা একজন দায়িত্বশীল উদ্যোক্তার কর্তব্য। পাশাপাশি ব্যবসায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং মুনাফা ও টার্নওভারের পার্থক্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সবশেষে তিনি বলেন, একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত স্বার্থের পাশাপাশি দেশের স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। “দেশের উন্নয়ন ও নিজের উন্নয়ন, দুটিকে একসাথে এগিয়ে নেওয়াই প্রকৃত সাফল্য,”-বলেন তিনি। তাঁর মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আগামী দিনে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।