অর্থনীতি

ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন, ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর (জুলাই-জুন) থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের একটি গণমাধ্যম থেকে উঠে এসেছে এসব সব তথ্য।

জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে বাড়তি অর্থের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের অর্ধেক বাস্তবায়ন করা হতে পারে।

গণমাধ্যমটিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তী দুই অর্থবছরে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পুরো বেতন কাঠামো দুই বছরে বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাবও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আহমেদ তিতুমীরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিললে আগামী অর্থবছর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।

অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, গত ২১ এপ্রিল জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত আগের কমিটিকে পুনর্গঠন করা হয়। সম্প্রতি কমিটি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। আর্থিক চাপ বিবেচনায় রেখে নবম পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। বেতন কমিশনও একই ধরনের মতামত দিয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’ গঠন করে। কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ও জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ড. এ কে এনামুল হক বলেন, নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই অধিক বাস্তবসম্মত। তার ভাষ্য, বাজারে মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কমিশন তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও কর আদায়ের দক্ষতা বাড়িয়ে এবং কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানো সম্ভব। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে থাকলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন বড় বাধার মুখে পড়বে না বলেও তিনি মনে করেন।

ড. এনামুল হক বলেন, নতুন পে স্কেলের মূল লক্ষ্য শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং সরকারি সেবার মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত না হলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আশা করা কঠিন। দারিদ্র্যজনিত চাপ কমাতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কমিশনের প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, বিভিন্ন ভাতা পর্যালোচনার জন্য পৃথক কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে এমন কর্মচারীদের জন্য মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাবও রয়েছে।

এ ছাড়া ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান এমন ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনভোগীদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনভোগীদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ২ লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি। বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল, ফলে পরিচালন ব্যয় মেটাতেও সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, করজাল সম্প্রসারণ এবং সরকারি কর্মচারীদের আয়করের আওতায় আনা গেলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন। তবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৪ লাখ উপকারভোগী সরাসরি এর আওতায় আসবেন।

সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি অনুযায়ী, ধাপে ধাপে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের পথেই এগোতে চায় সরকার।