অর্থনীতি

অ্যামচ্যামের সেমিনার: লজিস্টিকস খাতের সংস্কারে নীতিগত বাস্তবায়নের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে অংশীজনভিত্তিক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত এই আলোচনা ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে লজিস্টিকস খাতের সদস্যদের পাশাপাশি রপ্তানি-প্রস্তুত পোশাক শিল্প, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো, শিপিং লাইন, এয়ারলাইনস, কুরিয়ার সার্ভিস এবং উন্নয়ন সহযোগীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন অংশগ্রহণ করেন। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট এবং এগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্টও আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের সভাপতি ও লজিস্টিকস খাতের বিশেষজ্ঞ সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে লজিস্টিকস খাত একটি মৌলিক ও অপরিহার্য ভিত্তি। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে এই খাতে কিছু অগ্রগতি হলেও বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন, ডিকার্বনাইজেশন, ভূ-রাজনীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার মতো বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলো লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে দ্রুত রূপান্তরিত করছে উল্লেখ করে তিনি বিদ্যমান জ্ঞান ও সক্ষমতার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, লজিস্টিকস ব্যয় ১ শতাংশ কমলে রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাক্কলিত ৭৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনে বন্দর সক্ষমতা ও লজিস্টিকস অবকাঠামো সম্প্রসারণ জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জাতীয় লজিস্টিকস নীতির বাস্তবায়নে বিদ্যমান দুর্বলতার কথা তুলে ধরে তিনি রেল ও এয়ার কার্গোতে সরকারি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কেন্দ্রীয় লজিস্টিকস কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জাতীয় বাণিজ্যের বড় অংশ বহনকারী ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে কোল্ড চেইন ও রেল লজিস্টিকসে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এয়ার লজিস্টিকস ও এক্সপ্রেস কুরিয়ার খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে সিএফ গ্লোবালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম বলেন, ই-কমার্স নির্ভর এক্সপ্রেস লজিস্টিকসের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। তিনি জানান, ঢাকার বিমানবন্দরে লজিস্টিকস ব্যয় সড়ক পরিবহনের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি, যা প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে সীমিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট ও খালাস সুবিধা না থাকাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ ববি বলেন, ২০২২ সাল থেকে লজিস্টিকস সংস্কারে যে গতি তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের স্পষ্ট অগ্রাধিকার ও উচ্চপর্যায়ের ঐকমত্যের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। তিনি নীতি ও প্রক্রিয়া সরলীকরণ, মাল্টিমোডাল অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগ—এই পাঁচ স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ধাপভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচির প্রস্তাব দেন।

তিনি স্বল্পমেয়াদে জাতীয় লজিস্টিকস নীতি অনুমোদন ও কার্যকর করা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি লজিস্টিকস বিভাগ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন। মধ্যমেয়াদে ডব্লিউটিও বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনায় সিটিব্যাংক বাংলাদেশের সিটি কান্ট্রি অফিসার মো. মইনুল হক শুল্ক আইন ২০২৩ দ্রুত কার্যকরের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইলেকট্রনিক ডকুমেন্টেশন ও ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি স্পষ্ট না হলে বাণিজ্য সহজীকরণ কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিতে লেটার অব ক্রেডিটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

সামগ্রিক আলোচনায় বক্তারা জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৫-এর অনুমোদন ও সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রণয়নের মাধ্যমে নীতিগত অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান। মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার বিস্তার, ডিজিটাল লজিস্টিকস উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের কাঠামোবদ্ধ সম্পৃক্ততাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে—এমন অভিমত উঠে আসে আলোচনায়।