অর্থনীতি

নকল ও চোরাই পণ্যে বাজার সয়লাব: দেশীয় শিল্প, ভোক্তা ও রাজস্বের নীরব ক্ষয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাজারে পা রাখলেই একটি বাস্তবতা স্পষ্ট, নামী ব্র্যান্ডের আদলে তৈরি নকল পণ্য, শুল্ক–কর ফাঁকি দিয়ে আসা চোরাই সামগ্রী এবং অনিয়ন্ত্রিত আমদানির ছায়া ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। দামে সস্তা বলে এগুলো দ্রুত ক্রেতা পাচ্ছে, কিন্তু এর আড়ালে যে ক্ষতি জমছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্প, ভোক্তার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

নকল ও চোরাই পণ্যের বিস্তার কেন বাড়ছে

নকল ও চোরাই পণ্যের বিস্তারের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করছে। একদিকে বৈধ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক–কর, অন্যদিকে সীমান্ত ও বাজার তদারকির দুর্বলতা, এই দুইয়ের ফাঁক গলে বাজারে ঢুকে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিত পণ্য। প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস সহজ হওয়ায় এখন নকল পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত ও সংগঠিত।

দেশীয় কোম্পানির প্রতিযোগিতাহীন লড়াই

দেশীয় উৎপাদকরা বৈধ পথে কাঁচামাল আমদানি করে, শ্রম আইন মেনে উৎপাদন করে, কর দেয়। ফলে তাদের পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি পড়ে। বিপরীতে নকল ও চোরাই পণ্য এসব খরচ এড়িয়ে বাজারে আসে কম দামে। এই অসম প্রতিযোগিতায় দেশীয় কোম্পানিগুলো বাজার হারাচ্ছে, বিনিয়োগ কমাচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ করতেও বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে শিল্পায়নের গতি শ্লথ হয়।

রাজস্ব ক্ষতি

চোরাই পণ্য মানেই শুল্ক ও কর ফাঁকি। ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বড় অঙ্কে। এই ক্ষতি শুধু সংখ্যার নয়; অবকাঠামো, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সম্ভাব্য অর্থ বাজারের অনিয়মে আটকে যাচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে শেষ পর্যন্ত করের বোঝা বাড়ে বৈধ ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ওপর।

ভোক্তার জন্য ঝুঁকি

নকল পণ্যের বড় সমস্যা মান নিয়ন্ত্রণে। খাদ্য, কসমেটিকস, ওষুধ বা বৈদ্যুতিক পণ্যের ক্ষেত্রে নকলের ঝুঁকি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। স্বল্পমেয়াদে দাম কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির মূল্য।

বাজার শৃঙ্খলায় নেতিবাচক প্রভাব

নকল ও চোরাই পণ্যের আধিপত্য বাজারে এক ধরনের অস্বচ্ছতা তৈরি করে। বৈধ ব্যবসায়ীরা আস্থা হারায়, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। এতে কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ে। বাজার যখন নিয়মের বাইরে চলে যায়, তখন তা নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে।

আইন ও তদারকির সীমাবদ্ধতা

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সীমান্ত, পাইকারি বাজার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সব জায়গায় সমন্বিত নজরদারি না থাকলে নকল পণ্যের চক্র ভাঙা কঠিন। মাঝে মাঝে অভিযান হলেও তা টেকসই ফল দিচ্ছে না।

সমাধানের পথ

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান একমুখী নয়।

  • শুল্ক–কর কাঠামোয় ভারসাম্য আনতে হবে, যাতে বৈধ আমদানি ও উৎপাদন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

  • বাজার তদারকি জোরদার ও নিয়মিত অভিযান দরকার।

  • ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে হবে, দাম কম হলেই পণ্য গ্রহণের প্রবণতা বদলাতে হবে।

  • ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ব্র্যান্ড সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নকল শনাক্ত সহজ করতে হবে।

শেষ কথা

নকল ও চোরাই পণ্য আপাতদৃষ্টিতে সস্তা সমাধান মনে হলেও এর প্রকৃত মূল্য দিতে হচ্ছে দেশীয় শিল্প, ভোক্তা এবং রাষ্ট্রকে। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে না, আর টেকসই অর্থনীতির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই নকল ও চোরাই পণ্যের বিরুদ্ধে লড়াই এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।