শিক্ষা

বেস্টসেলার বনাম মানসম্মত সাহিত্য: পাঠকের রুচি বদলাচ্ছে কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক

একটি বই বেস্টসেলার হওয়া মানেই কি সেটি ভালো সাহিত্য? নাকি ভালো সাহিত্য মানেই জনপ্রিয় হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই? এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

কারণ আজকের পাঠক আগের পাঠকের মতো নয়, আর সাহিত্যও আর শুধু সাহিত্যের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাজার, ব্র্যান্ডিং ও দৃশ্যমানতার অংশ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বেস্টসেলার ও মানসম্মত সাহিত্যের দূরত্ব বাড়ছে, আর পাঠকের রুচি বদলাচ্ছে। কেন, কীভাবে এবং এর ফল কী, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এখন জরুরি।

বেস্টসেলার কী, মানসম্মত সাহিত্যই বা কী

বেস্টসেলার মূলত একটি বাণিজ্যিক সংজ্ঞা- যে বই বেশি বিক্রি হয়, দ্রুত ছড়ায়, আলোচনায় থাকে। এর সঙ্গে সাহিত্যিক মানের সম্পর্ক থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে।

অন্যদিকে মানসম্মত সাহিত্য-

  • সময় নেয়

  • পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে

  • সহজ বিনোদনের বাইরে প্রশ্ন তোলে

  • অনেক সময় অস্বস্তিও তৈরি করে

এই দুইয়ের লক্ষ্য এক নয়। বেস্টসেলার চায় দ্রুত পাঠক, মানসম্মত সাহিত্য চায় গভীর পাঠক।

পাঠকের রুচি বদলাচ্ছে, কিন্তু কেন?

রুচি হঠাৎ বদলায় না; এটি সমাজের পরিবর্তনের প্রতিফলন।

১. সময়ের অভাব ও দ্রুততার সংস্কৃতি

আজকের পাঠক ব্যস্ত। দীর্ঘ মনোযোগ দেওয়ার সময় কম। ফলে-

  • সহজ ভাষা

  • দ্রুত প্লট

  • তাৎক্ষণিক আবেগ

এসবের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। গভীর, ধীর সাহিত্য সময় চায়, যা এখন অনেকের কাছে বিলাসিতা।

২. বিনোদন-কেন্দ্রিক জীবনের প্রভাব

ওটিটি, শর্ট ভিডিও, রিল, এই সংস্কৃতি পাঠককে অভ্যস্ত করেছে দ্রুত উত্তেজনায়। সাহিত্যও সেখানে প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। ফলাফল-

  • গল্প চাই সহজ

  • ভাব চাই কম

  • শেষ চাই দ্রুত

এই মানসিকতা মানসম্মত সাহিত্যের পক্ষে প্রতিকূল।

৩. বাজার ও প্রকাশনার ভূমিকা

আজ প্রকাশনা শুধু সাহিত্য নয়, পণ্যও তৈরি করছে।

  • প্রচার পায় যে বই বিক্রির সম্ভাবনা বেশি

  • পরিচিত মুখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় লেখক অগ্রাধিকার পান

  • ঝুঁকিপূর্ণ বা পরীক্ষামূলক সাহিত্য পেছনে পড়ে যায়

ফলে পাঠকের সামনে যে বই আসে, তার মধ্যেই রুচি গড়ে ওঠে।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

আজ সাহিত্য আলোচনার বড় অংশ চলে এসেছে ফেসবুক পোস্ট, রিভিউ ভিডিও, ট্রেন্ডিং তালিকায়।

  • ভাইরাল হওয়া মানে ভালো হওয়া

  • আলোচিত মানে মানসম্মত

এই সমীকরণ পাঠকের বিচারবোধকে প্রভাবিত করছে। গভীর সাহিত্য ভাইরাল হয় না, এটি ধীরে কাজ করে।

পাঠকের দায় কি একেবারেই নেই?

সব দায় প্রকাশনা বা বাজারের নয়। পাঠকেরও দায় আছে।

আমরা অনেক সময়-

  • আরামদায়ক লেখা চাই

  • নিজের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে এমন লেখা এড়িয়ে যাই

  • কঠিন সাহিত্যকে ‘বিরক্তিকর’ বলে সরিয়ে রাখি

কিন্তু সাহিত্য যদি আমাদের না নাড়ায়, না অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে তা সমাজ বদলাবে কীভাবে?

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে সংকট কোথায়

বাংলাদেশে পাঠাভ্যাস এমনিতেই দুর্বল। তার ওপর-

  • পাঠ্যক্রমে সাহিত্য পড়া মানে পরীক্ষার বিষয়

  • সমালোচনার সংস্কৃতি দুর্বল

  • সাহিত্য আলোচনা সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ

ফলে পাঠক ধীরে ধীরে সহজপাচ্য ও নিরাপদ লেখার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এখানে মানসম্মত সাহিত্য অনেক সময় পাঠক পায় না, আলোচনাও পায় না।

মানসম্মত সাহিত্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?

না। মানসম্মত সাহিত্য হারায় না, কিন্তু প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এটি কম আলো পায়, ধীরে ছড়ায়, সীমিত পাঠক তৈরি করে। ইতিহাস বলছে- আজকের অনেক ক্লাসিক একসময় বেস্টসেলার ছিল না।

সমস্যা তখনই, যখন পুরো সাহিত্যপরিসর শুধু বেস্টসেলারনির্ভর হয়ে পড়ে।

দুই ধারার সহাবস্থান কি সম্ভব?

সম্ভব, যদি ভারসাম্য থাকে।

  • বেস্টসেলার পাঠক তৈরি করতে পারে

  • মানসম্মত সাহিত্য পাঠককে গড়ে তোলে

একটি ছাড়া অন্যটি টেকসই নয়। প্রশ্ন হলো- আমরা কি পাঠককে কেবল ক্রেতা ভাবছি, নাকি চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে দেখছি?

উত্তরণের পথ: পাঠক রুচি কীভাবে গভীর হবে

  • সাহিত্য সমালোচনার সংস্কৃতি জোরদার

  • স্কুল-কলেজে আনন্দভিত্তিক সাহিত্য পাঠ

  • প্রকাশনায় ঝুঁকিপূর্ণ সাহিত্যকে জায়গা

  • মিডিয়ায় মানসম্মত সাহিত্য আলোচনা

  • পাঠককে ধীরে ধীরে গভীর পাঠে অভ্যস্ত করা

রুচি চাপিয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু পরিবেশ তৈরি করা যায়।

বেস্টসেলার ও মানসম্মত সাহিত্যের দ্বন্দ্ব আসলে সাহিত্যের সংকট নয়, এটি পাঠসংস্কৃতির সংকট। পাঠক যদি শুধু আরাম খোঁজে, সাহিত্যও আরাম দেবে। কিন্তু পাঠক যদি প্রশ্ন খোঁজে, সাহিত্যও প্রশ্ন তুলবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই-

আমরা কি শুধু বই পড়ছি, নাকি চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তুলছি?

এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ পথচলা।