একটি সমাজে পাঠাভ্যাস কেবল ব্যক্তিগত রুচির বিষয় নয়, এটি একটি শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা বা ব্যর্থতার অন্যতম সূচক।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থী বের হচ্ছে, ডিগ্রি অর্জন করছে, তবু পাঠক তৈরি হচ্ছে না।
প্রশ্ন তাই জরুরি হয়ে উঠেছে-
পাঠাভ্যাস তৈরিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ব্যর্থ হচ্ছে?
পাঠাভ্যাস মানে শুধু পাঠ্যবই পড়া নয়।
এর অর্থ-
জানার আগ্রহ
প্রশ্ন করার প্রবণতা
চিন্তার গভীরতা
ভাষা ও অনুভবের বিকাশ
যে শিক্ষা ব্যবস্থা পাঠাভ্যাস তৈরি করতে পারে না,
সে ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কেবল পরীক্ষার্থী তৈরি করে, শিক্ষার্থী নয়।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, সবকিছু পরীক্ষার জন্য।
শিক্ষার্থী পড়ে-
কী পড়লে প্রশ্ন আসবে
কী মুখস্থ করলে নম্বর বাড়বে
এই কাঠামোতে-
পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়া সময়ের অপচয় বলে মনে হয়, গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা হয়ে ওঠে ‘অপ্রয়োজনীয়’।
ফলে পাঠাভ্যাসের জায়গা শুরুতেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার আছে-
কিন্তু সেগুলো প্রায়ই-
অচল
পুরোনো বইয়ে ভরা
তালাবদ্ধ
পাঠাগারকে শেখার প্রাণকেন্দ্র না বানিয়ে
তাকে প্রশাসনিক আনুষঙ্গিক হিসেবে দেখা হয়।
ফলে শিক্ষার্থীর কাছে পাঠাগার কোনো জীবন্ত জায়গা নয়, বরং পরীক্ষার নোটের গুদাম।
পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে অনুপ্রেরণায়।
কিন্তু অনেক শিক্ষকই নিজেরা পাঠাভ্যাসের চর্চা থেকে দূরে।
কারণ-
শিক্ষক প্রশিক্ষণে পাঠসংস্কৃতির গুরুত্ব নেই
সিলেবাস শেষ করাই প্রধান দায়িত্ব
বই পড়াতে সময় দিলে ‘পিছিয়ে পড়ার’ ভয়
ফলে শিক্ষকও পাঠাভ্যাসের বাহক হতে পারেন না।
বর্তমান পাঠ্যক্রমে সাহিত্য অনেক ক্ষেত্রে-
পরীক্ষার উপাদানে পরিণত
ব্যাখ্যা ও মুখস্থের বিষয়
সাহিত্য পড়ানো হয়, ‘এই লাইনের অর্থ কী’।
কিন্তু আলোচনা হয় না- ‘এই লেখা কেন জরুরি’ বা ‘এটা আমাদের কী বলে?’
ফলে সাহিত্য পাঠ আনন্দ নয়, দায়িত্ব হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাস বদলেছে, এটা সত্য।
কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনকে বুঝে নিতে পারেনি।
তারা-
ডিজিটাল পাঠকে স্বীকৃতি দেয় না, অনলাইন পাঠ্যবস্তুকে পাঠাভ্যাসের অংশ ভাবতে চায় না।
ফলে শিক্ষার্থী বই থেকেও দূরে যায়, ডিজিটাল পাঠ থেকেও শিখতে শেখে না।
পাঠাভ্যাস গড়তে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ ভূমিকা প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবে-
পরিবার চায় ভালো ফল
প্রতিষ্ঠান চায় ভালো রেজাল্ট
পাঠাভ্যাস, এই দু’পক্ষের অগ্রাধিকার তালিকায় নিচে পড়ে যায়।
পাঠাভ্যাসহীন শিক্ষাব্যবস্থার ফল ভয়াবহ-
চিন্তার গভীরতা কমে
ভাষা দুর্বল হয়
সহনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস পায়
এতে সমাজে তথ্যজানা মানুষ তৈরি হয়, চিন্তাশীল নাগরিক নয়।
তাহলে দায় কার?
এই ব্যর্থতার দায়- শুধু শিক্ষার্থীর নয়, শুধু শিক্ষকের নয়
এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা, যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার দর্শনই পাঠাভ্যাসের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে।
পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হলে দরকার-
পরীক্ষার বাইরেও পাঠের স্বীকৃতি
পাঠাগারকে জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসর করা
শিক্ষক প্রশিক্ষণে পাঠসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি
পাঠ্যক্রমে স্বাধীন পাঠের সুযোগ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পাঠাভ্যাসকে ফলের সঙ্গে নয়, মানুষ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা।
শিক্ষার্থীরা বই পড়ে না, এটা পুরো সত্য নয়।
আসল সত্য হলো, তাদের পড়তে শেখানো হয় না।
যে শিক্ষা ব্যবস্থা পাঠাভ্যাস তৈরি করতে ব্যর্থ,
সে ব্যবস্থা জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু মননশীল সমাজ গড়তে পারে না।
আজ তাই প্রশ্নটা শুধু পাঠাভ্যাসের নয়, আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই, সেই প্রশ্নের।