শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। তবে গত এক দশকে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। একসময় বিদেশে পড়তে যাওয়া ছিল সীমিত সংখ্যক মেধাবী বা উচ্চবিত্ত শিক্ষার্থীর স্বপ্ন; এখন এটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যেও একটি শক্তিশালী আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, মালয়েশিয়া কিংবা ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু এই প্রবণতার সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে-
এই বিদেশমুখিতা কি মূলত উন্নত শিক্ষার সন্ধান, নাকি এটি ক্রমশ অভিবাসনের একটি বিকল্প ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ হয়ে উঠছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ এর মধ্যে শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বৈশ্বিক শ্রমবাজার, সামাজিক মানসিকতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মতো বহু স্তর জড়িয়ে আছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে প্রথম এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ হলো উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আকর্ষণ।
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়-
* গবেষণাকেন্দ্রিক
* প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত
* আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন
* শিল্পখাতের সঙ্গে সংযুক্ত
ফলে শিক্ষার্থীরা মনে করে, সেখানে অর্জিত শিক্ষা তাদের বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করবে।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ডিগ্রি এখনও সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত কেবল একাডেমিক নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ জীবন পরিকল্পনার অংশ।
অনেক শিক্ষার্থী ও পরিবার মনে করে-
* উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ
* উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা
* উন্নত জীবনমান
* সামাজিক নিরাপত্তা
* দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
* বিদেশে যাওয়ার বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
ফলে “স্টুডেন্ট ভিসা” অনেক ক্ষেত্রে কেবল শিক্ষার নয়, বরং সম্ভাব্য অভিবাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একসময় বিদেশে পড়তে যাওয়া এবং বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা ছিল দুইটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত। বর্তমানে এই দুইয়ের মধ্যে দূরত্ব অনেক কমে গেছে।
বিশ্বের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য-
* পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট
* দক্ষ কর্মী ভিসা
* স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
প্রদান করছে।
ফলে একজন শিক্ষার্থী এখন জানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর তার সামনে শুধু দেশে ফিরে আসার পথ নয়, বরং বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগও রয়েছে। এ কারণেই শিক্ষা ও অভিবাসনের প্রশ্ন ক্রমশ একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে।
কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থান সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
ফলে অনেক তরুণ মনে করে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ তুলনামূলক বেশি।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে হতাশা
দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হলেও-
* গবেষণা অবকাঠামো
* আন্তর্জাতিক সংযোগ
* শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা
নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, বিদেশে তারা আরও সমৃদ্ধ একাডেমিক পরিবেশ পাবে।
সামাজিক প্রভাব
বিদেশে পড়তে যাওয়া এখন অনেক ক্ষেত্রে একটি সামাজিক সাফল্যের প্রতীক।
পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও এই সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতাকে শুধুমাত্র “মেধা পাচার” হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হবে।
বৈশ্বিক দক্ষতা অর্জন
আন্তর্জাতিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের-
* নতুন সংস্কৃতি
* বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
* উন্নত প্রযুক্তি
* গবেষণার অভিজ্ঞতা
অর্জনের সুযোগ দেয়।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক
বিদেশে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক পেশাগত ও একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে।
রেমিট্যান্স ও জ্ঞান প্রবাহ
বিদেশে প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীরা অর্থনৈতিক অবদান রাখার পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাও দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন।
মেধা পাচার
সবচেয়ে আলোচিত উদ্বেগ হলো “Brain Drain”।
যখন দেশের সেরা মেধাবীদের বড় অংশ বিদেশে স্থায়ী হয়ে যায়, তখন দেশ মানবসম্পদ ও গবেষণাগত সক্ষমতার ক্ষতির মুখে পড়ে।
শিক্ষা নাকি অভিবাসন ব্যবসা?
কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নকে ঘিরে একটি বাণিজ্যিক শিল্পও গড়ে উঠেছে।
অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, কোর্সের উপযোগিতা বা ক্যারিয়ার সম্ভাবনা যাচাই না করেই শুধুমাত্র বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদেশের জীবনকে প্রায়ই অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু বাস্তবে-
* উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়
* সাংস্কৃতিক অভিযোজন
* মানসিক চাপ
* চাকরির প্রতিযোগিতা
অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে অনেক গবেষক “Brain Drain” ধারণার পাশাপাশি “Brain Circulation”-এর কথা বলছেন।
অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি বিদেশে পড়াশোনা বা কাজ করলেও-
* গবেষণা সহযোগিতা
* বিনিয়োগ
* প্রযুক্তি স্থানান্তর
* অনলাইন শিক্ষা
এর মাধ্যমে নিজের দেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে।
ফলে বিদেশে যাওয়া মানেই সবসময় দেশের জন্য ক্ষতি, এমন ধারণাও এখন প্রশ্নের মুখে।
এই বাস্তবতায় শুধু বিদেশমুখিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেই হবে না।
প্রয়োজন-
* গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি
* বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন
* শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার
* দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি
* আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
যাতে বিদেশে পড়াশোনা একটি সুযোগ হয়, বাধ্যবাধকতা নয়।
বিদেশে পড়াশোনার বর্তমান ঢেউকে কেবল শিক্ষা বা কেবল অভিবাসনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বাস্তবে এটি দুইয়েরই সমন্বয়।
একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে উন্নত জ্ঞান অর্জনের জায়গা, আবার একইসঙ্গে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক ক্যারিয়ারের পথও।
তাই মূল প্রশ্ন বিদেশে যাওয়া উচিত কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো-
শিক্ষা কি এখনও এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে, নাকি উচ্চশিক্ষা ধীরে ধীরে অভিবাসনের একটি কৌশলগত রুটে পরিণত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেশভেদে, পরিবারভেদে এবং ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিদেশে পড়াশোনার বর্তমান প্রবণতা শুধু শিক্ষার নয়; এটি আমাদের সময়ের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।