শিক্ষা সংস্কারত, শুনতে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই হতাশাজনক।
নতুন নীতি আসে, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বড় বড় শব্দে পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। তবু মাঠপর্যায়ে শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা খুব একটা বদলায় না। প্রশ্ন তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, শিক্ষা সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয় কেন? সমস্যাটা কি নীতির অভাবে, নাকি বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগহীন নীতিতে?
বাংলাদেশসহ বহু দেশে শিক্ষা সংস্কার শুরু হয় নথিপত্র দিয়ে। নীতিতে থাকে আধুনিক শব্দ, সৃজনশীল শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। কিন্তু এই নীতিগুলো প্রণয়ন হয় মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক কক্ষগুলোতে, যেখানে শ্রেণিকক্ষের দৈনন্দিন বাস্তবতা খুব কমই উপস্থিত থাকে।
ফলে নীতি হয় আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় দেখা যায়- স্কুলে শিক্ষক নেই, প্রশিক্ষণ নেই, অবকাঠামো নেই, সময় নেই। নীতি আর বাস্তবতার মাঝে তৈরি হয় এক বিশাল ফাঁক।
শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, এটি প্রায়ই শিক্ষকদের বাদ দিয়েই পরিকল্পিত হয়। অথচ শিক্ষকই নীতির বাস্তব রূপকার। শিক্ষককে প্রশিক্ষণ, মর্যাদা ও সিদ্ধান্তে অংশীদার না করে সংস্কার চাপিয়ে দিলে তা প্রতিরোধের মুখে পড়ে বা কাগজেই আটকে যায়।
অনেক শিক্ষক সংস্কারকে দেখেন অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে, কারণ-
নতুন পদ্ধতির যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই
কাজের চাপ বাড়ে, স্বীকৃতি বাড়ে না
সিদ্ধান্তে তাদের মতামত নেওয়া হয় না
এই বিচ্ছিন্নতাই সংস্কারকে ভঙ্গুর করে তোলে।
নীতিতে যতই দক্ষতা, সৃজনশীলতা বা সমালোচনামূলক চিন্তার কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পরীক্ষা ও ফলাফল। যতদিন মূল্যায়ন ব্যবস্থা বদলাবে না, ততদিন শিক্ষা সংস্কার কার্যকর হবে না।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই জানে, শেষ পর্যন্ত বিচার হবে নম্বর দিয়ে। ফলে নতুন পদ্ধতির ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয় না।
শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য দরকার সমন্বিত প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়-
একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব বিভাজন
সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব
মাঠপর্যায়ের সমস্যা ওপর পর্যন্ত পৌঁছায় না
ফলে নীতি বাস্তবায়ন হয় খণ্ডিতভাবে, অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।
শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে কম শোনা যায় শিক্ষার্থীর কণ্ঠ। অথচ শিক্ষার্থীই সবচেয়ে ভালো জানে-
কোন পদ্ধতি তার জন্য কার্যকর
কোন চাপ অপ্রয়োজনীয়
কোন পরিবর্তন বাস্তবে সম্ভব
শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা ছাড়া তৈরি নীতি প্রায়শই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না।
সংস্কার শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়, এটি সামাজিকও। অভিভাবক ও সমাজ এখনো ফলাফলকেই সফলতার মানদণ্ড হিসেবে দেখে। ফলে-
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রতি অনাস্থা
পরীক্ষার বাইরে শেখাকে গুরুত্ব না দেওয়া
ঝুঁকি নিতে অনীহা
এই মানসিকতা না বদলালে সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
শিক্ষা সংস্কারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা খাত অনেক সময় অগ্রাধিকার তালিকার নিচে থাকে। অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা ও মানসিক সহায়তা উপেক্ষিত থেকে যায়।
সংস্কার তখন হয়ে ওঠে খণ্ডকালীন প্রকল্প, টেকসই পরিবর্তন নয়।
শিক্ষা সংস্কার ফল দেয় ধীরে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত ফল চায়। সরকার বদলালে নীতিও বদলায়, আগের সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থায়িত্ব গড়ে ওঠে না।
সংস্কার কেন ব্যর্থ হয়-
মূল কারণগুলো সংক্ষেপে
নীতি প্রণয়নে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অংশীদার না করা
পরীক্ষানির্ভর মানসিকতা
প্রশাসনিক জটিলতা
সামাজিক মানসিক প্রস্তুতির অভাব
পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সংকট
কার্যকর শিক্ষা সংস্কারের জন্য দরকার-
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে নীতি প্রণয়নে যুক্ত করা
মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, এককালীন চাপ নয়
সামাজিক সচেতনতা ও অভিভাবক সম্পৃক্ততা
রাজনৈতিক ঐকমত্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
শিক্ষা সংস্কার ব্যর্থ হয়, কারণ আমরা পরিবর্তন চাই দ্রুত, কিন্তু প্রস্তুতি নেই গভীর। নীতি বানাই উচ্চাশায়, বাস্তবায়ন করি অর্ধহৃদয়ে। শিক্ষা কোনো প্রকল্প নয়, এটি একটি প্রজন্ম গঠনের প্রক্রিয়া।
প্রশ্ন তাই, শুধু সংস্কার হবে কি না। তা নয়-
প্রশ্ন হলো, আমরা কি বাস্তবতার সঙ্গে চোখ রেখে সংস্কার করতে প্রস্তুত?
এই প্রস্তুতিই নির্ধারণ করবে শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ।