সাহিত্য কাদের জন্য লেখা হয়, এই প্রশ্নটি নতুন নয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নটি নতুন করে জরুরি হয়ে উঠেছে।
কারণ একদিকে বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়ছে, সাহিত্য উৎসব হচ্ছে, লেখকের উপস্থিতি বাড়ছে সামাজিক মাধ্যমে-
অন্যদিকে সাধারণ পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের দূরত্বও বাড়ছে বলে অভিযোগ।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে-
সমসাময়িক সাহিত্য কি এখনও সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলছে, নাকি সে ভাষা আজ অন্য কোথাও সরে গেছে?
এখানে ‘সাধারণ মানুষের ভাষা’ বলতে কেবল সহজ শব্দ বা কথ্য রীতিকে বোঝানো হচ্ছে না।
এর অর্থ আরও গভীর-
যে ভাষা জীবনের অভিজ্ঞতা বহন করে
যে ভাষা সমাজের বাস্তবতা, টানাপোড়েন ও স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত
যে ভাষা পাঠককে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং কাছে টানে
সাধারণ মানুষের ভাষা মানে তাই অগভীর ভাষা নয়, বরং সংযোগময় ভাষা।
সমসাময়িক সাহিত্যের একটি বড় অংশে ভাষা হয়ে উঠেছে-
অতিমাত্রায় বিমূর্ত
তত্ত্বনির্ভর
কখনো কখনো আত্মমগ্ন
ফলে সাধারণ পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে, “এই লেখা কি আমাকে নিয়ে, না লেখক নিজেকেই লিখছেন?”
এখানেই তৈরি হয় পাঠক-বিচ্ছিন্নতা।
আজকের সাহিত্যচর্চার বড় অংশ ঘোরাফেরা করে-
সাহিত্য পুরস্কার
উৎসব
নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীর ভেতর
এই পরিসরে লেখার মূল্যায়ন হয়-
ভাষার জটিলতা দিয়ে
আন্তঃপাঠ ও তত্ত্বের রেফারেন্স দিয়ে
কিন্তু সাধারণ পাঠকের অনুভব, অভিজ্ঞতা বা পাঠ-স্বাচ্ছন্দ্য এখানে খুব কমই বিবেচনায় আসে।
ফলে সাহিত্য ধীরে ধীরে পাঠকের জন্য নয়, বরং পাঠকের ওপর লেখার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
একদিকে দেখা যায়, সহজ ভাষায় লেখা বই বিপুল পাঠক পাচ্ছে, কিন্তু সেগুলোকে অনেক সময় ‘হালকা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, সমালোচকপ্রশংসিত বহু লেখা পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য।
এই বিভাজন প্রশ্ন তোলে- ভাষা সহজ হলেই কি সাহিত্য মানহীন হয়?
নাকি আমরা মানের সংজ্ঞাটাই সংকীর্ণ করে ফেলেছি?
আজকের সমাজে রয়েছে-
শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা
মধ্যবিত্তের টিকে থাকার সংগ্রাম
প্রান্তিক মানুষের নীরব লড়াই
কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলো যখন সাহিত্যে আসে, তখন অনেক সময় তা-
অতিরিক্ত প্রতীকী হয়ে যায়
বাস্তবের ধার হারায়
ফলে পাঠক নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান না।
অনেক লেখক সচেতনভাবেই কঠিন ভাষা বেছে নেন, যেন লেখা ‘গভীর’ মনে হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- গভীরতা কি ভাষার দুর্বোধ্যতায় নিহিত, না ভাবনার সততায়?
ইতিহাস বলে- মানুষের ভাষায় লেখা সাহিত্যই দীর্ঘদিন টিকে থাকে।
ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠক আজ-
দ্রুত অর্থ ধরতে চায়
আবেগ ও বাস্তব সংযোগ খোঁজে
এই বাস্তবতায় যদি সাহিত্য তার ভাষা ও ভঙ্গি পুনর্বিবেচনা না করে,
তবে পাঠক সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, এটাই স্বাভাবিক।
না। সাহিত্যকে সরলীকরণ নয়, মানবিকরণ করতে হবে।
এর মানে-
ভাষা হবে অনুভবযোগ্য
ভাব হবে সংযোগমুখী
লেখক পাঠকের অস্তিত্ব স্বীকার করবেন
সাধারণ মানুষের ভাষায় লেখা মানে পাঠকের প্রতি সম্মান।
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ।
যদি সাহিত্য কেবল নিজের গণ্ডিতে কথা বলে,
তবে সে ধীরে ধীরে একা হয়ে যাবে।
আর যদি সাহিত্য মানুষের জীবনের ভাষায় কথা বলে,
তবে সে হয়ে উঠবে, সময়ের দলিল, সমাজের দর্পণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই ভাষার নয়- সাহিত্য কার পাশে দাঁড়াতে চায়, সেই সিদ্ধান্তের।