শুক্রবার অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস ও অবৈধ ডিভাইস ব্যবহারের একাধিক আলামত সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রে আটক, প্রযুক্তিগত জালিয়াতির ইঙ্গিত, সব মিলিয়ে আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে একটি মৌলিক সত্য: যারা জাতি গড়ার দায়িত্ব নিতে চায়, তারা নিজেরাই কি নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে?
এই প্রশ্ন শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কোনো সাধারণ সরকারি চাকরির পরীক্ষা নয়। এখান থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিরা সরাসরি যুক্ত থাকবেন শিশুদের মানসিক গঠন, নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনা তৈরির সঙ্গে। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেখান না, তিনি আচরণ, সততা ও মূল্যবোধের নীরব পাঠও দেন।
সেই মহান জগতে প্রবেশের প্রক্রিয়াতেই যদি জালিয়াতি, প্রশ্নফাঁস বা প্রযুক্তিগত প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে- অসুদপায়ে শুধুমাত্র চাকরি করতে আসা এই শিক্ষক নামধারীদের থেকে জাতির প্রত্যাশা পুরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি ?
প্রশ্নফাঁস বা ডিভাইস ব্যবহারের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অসততা নয়, কাজ করে একটি গভীর মানসিক সংকট। বহু প্রার্থী হয়তো মনে করেন-
সবাই করছে, না করলে পিছিয়ে পড়বো
চাকরি পেলে পরে ভালো শিক্ষক হবো
সিস্টেমই যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, আমি কেন একা সৎ থাকবো
এই যুক্তিগুলো শোনাতে বাস্তব মনে হলেও, এগুলোই আসলে নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ। কারণ এখানেই অপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। আমাদের মনে রাখা উচিৎ, প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হলেই কেবলমাত্র দেশ ও রাষ্ট্র সুন্দর হবে।
যে ব্যক্তি শিক্ষাদান করতে চান অসদুপায় অবলম্বন করে, তিনি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে-
নৈতিকতার পাঠ কীভাবে দেবেন?
সততা নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার কোথায় পাবেন?
শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তিনি কীভাবে নিজেকে আয়নায় দেখবেন?
শিক্ষকতার বড় শক্তি হলো নৈতিক কর্তৃত্ব। সেই কর্তৃত্ব যদি যোগদানের শুরুতেই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষকতা কেবল পেশা হয়, আদর্শ নয়।
এই সংকটের দায় শুধু পরীক্ষার্থীদের নয়। বারবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রমাণ করে-
প্রশ্ন প্রণয়ন ও সংরক্ষণে দুর্বলতা
পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় ফাঁক
প্রযুক্তিগত নজরদারির সীমাবদ্ধতা
জবাবদিহির অভাব
যতদিন এসব জায়গায় কঠোর সংস্কার না আসবে, ততদিন অনিয়ম থামবে না, শুধু কৌশল বদলাবে।
কারণ, ডিভাইস ব্যবহারের চেয়ে প্রশ্নফাঁসের উদাহরণ বেশি। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, সরিষার ভিতর ভূত না থাকলে এমনটা হওয়ার সু্যোগ নেই। অর্থাৎ, নীতিনির্ধারকদের মাঠ পর্যায়ে দূর্নীতি রোধে নামার আগে নিজ কক্ষের অপরাধীদের নির্মূল করা উচিৎ। এতে প্রতিরোধ প্রক্রিয়াও সহজতর হওয়ার কথা। কারণ, ভিতর থেকে প্রশ্ন বাইরে না আসলে, তা কোনো অতিপ্রাকৃত উপায়ে সম্ভব নয়।
শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শৃঙ্খল। দুর্বল শিক্ষক মানে দুর্বল শিক্ষার্থী, আর দুর্বল শিক্ষার্থী মানে দুর্বল ভবিষ্যৎ নাগরিক। প্রাথমিক স্তরেই যদি শিক্ষকতায় নৈতিক পঁচন ধরে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে-
শিক্ষার্থীর নৈতিক বোধে
রাষ্ট্রের নাগরিক সংস্কৃতিতে
দুর্নীতি স্বাভাবিকীকরণে
এভাবে অসদুপায়ে শিক্ষক হওয়া মানে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নীরবে একটি বার্তা পাঠানো যে, সাফল্যের জন্য সততা জরুরি নয়।
অসুদপায় অবলম্বন প্রতিরোধ যথাযথ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব।অ
কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কি এমন শিক্ষক চাই, যারা ধরা না পড়লে অসদুপায়কে অপরাধ মনে করে না?
এটি কেবল প্রশাসনিক নয়, নৈতিক মূল্যবোধের চরম সংকট।
শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই আসে, যখন নৈতিকতা পরীক্ষার সিলেবাস থেকে বাদ পড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় জরুরি কিছু সিদ্ধান্ত-
শিক্ষক নিয়োগে শূন্য সহনশীলতা নীতি
প্রশ্নফাঁস প্রমাণিত হলে আজীবন সরকারি চাকরি থেকে নিষেধাজ্ঞা
প্রযুক্তিনির্ভর কিন্তু দায়িত্বশীল নজরদারি
শিক্ষকতার জন্য নৈতিক যোগ্যতা যাচাই
শিক্ষক পেশাকে আবার সামাজিক মর্যাদার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে
শুধু শাস্তি নয়, সামাজিক ও মানসিক সংস্কারও জরুরি।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে যে শ্রেণিকক্ষে, তার দ্বার উন্মোচন করেন শিক্ষক।
যদি সেই দরজার চাবিই জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়, তাহলে ভেতরের ঘর কতটা নিরাপদ ও প্রাসঙ্গিক থাকবে?
প্রশ্ন তাই আর শুধু প্রশ্নফাঁস নয়-
প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন মানুষকে জাতি গড়ার দায়িত্ব দিতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে, পরীক্ষার প্রশ্ন বদলালেও সংকট বদলাবে না।