শিক্ষা মানে শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষা মানে মানুষ গড়া। কিন্তু যে মানুষটি প্রতিদিন উদ্বেগ, চাপ, হতাশা বা ভয়ের ভেতর দিয়ে যায়, তার কাছ থেকে আমরা কী ধরনের শেখা প্রত্যাশা করি? এই প্রশ্নটি যতটা সহজ, বাস্তবে তার উত্তর ততটাই অস্বস্তিকর। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য এখনো কোনো মৌলিক অধিকার নয়, বরং এক ধরনের নীরব উপেক্ষা।
শিক্ষার্থী হোক বা শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষের ভেতরে মানসিক চাপ আছে, কিন্তু সে চাপ নিয়ে কথা বলার জায়গা নেই।
মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শেখার পূর্বশর্ত। মন যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে মনোযোগ থাকে না, কৌতূহল জন্মায় না, স্মৃতিও স্থায়ী হয় না। গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও উদ্বেগ সরাসরি শেখার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
তবু বাস্তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়-
ভালো ছাত্র মানে চাপ সহ্য করতে পারা ছাত্র
কান্না মানে দুর্বলতা
উদ্বেগ মানে অজুহাত
এই দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যার মূল।
আজকের শিক্ষার্থী বেড়ে উঠছে এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে-
ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা
পরীক্ষা-ভীতি
পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুকে শেখানো হচ্ছে, ভুল করা বিপজ্জনক। এই ভয় ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, শেখাকে আনন্দ নয়, বোঝা করে তোলে।
বিশেষ করে কিশোর বয়সে এই চাপ আরও তীব্র হয়, কিন্তু সেখানে সহায়তার জায়গা সবচেয়ে কম।
মানসিক স্বাস্থ্য সংকট শুধু শিক্ষার্থীর নয়, শিক্ষকেরও।
একজন শিক্ষককে একসঙ্গে হতে হয়-
ফলাফল নিশ্চিতকারী
শৃঙ্খলার রক্ষক
প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মানুষ
আবার মানবিক অভিভাবক
এই বহুমুখী চাপের জন্য কোনো কাঠামোগত মানসিক সহায়তা নেই। ফলে শিক্ষক নিজেই ক্লান্ত, হতাশ ও অনুপ্রেরণাহীন হয়ে পড়েন।
আর একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষক কখনোই শিক্ষার্থীর মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো নীরবতার সংস্কৃতি। মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বলা এখনো লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
কাউন্সেলিং মানে ‘সমস্যাযুক্ত’ হওয়া
মানসিক চাপ মানে দুর্বলতা
সাহায্য চাওয়া মানে ব্যর্থতা
ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, উভয়েই নিজের ভেতর সংগ্রাম লুকিয়ে রাখে।
এই চাপ একসময় বিস্ফোরিত হয়- ড্রপআউট, সহিংসতা, আত্মবিশ্বাসের পতন বা গভীর হতাশায়।
শিক্ষানীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবায়নে সেটি প্রায় অনুপস্থিত। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-
প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আলাদা ক্লাস নেই
শিক্ষকরা মানসিক সংকট চিহ্নিত করার প্রশিক্ষণ পান না
ফলে সংকট বোঝার আগেই সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গ্রামীণ এলাকায় সেবা প্রায় নেই
শহরে সেবার খরচ নাগালের বাইরে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না
এখানে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়।
যদি মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে-
ভালো পরীক্ষার্থী, কিন্তু দুর্বল মানুষ
তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু আবেগগতভাবে অসুস্থ নাগরিক
দক্ষ কর্মী, কিন্তু অস্থির সমাজ
এটি কোনো টেকসই উন্নয়ন নয়।
বাস্তবভিত্তিক কিছু করণীয়-
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবা
শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ
পাঠ্যক্রমে আবেগগত ও সামাজিক শিক্ষা
পরীক্ষানির্ভর চাপ কমানো
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক সুস্থতাকে শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
শিক্ষা যদি মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য তার ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে, যত বড় ভবনই তৈরি করা হোক না কেন, তা টেকসই হবে না।
প্রশ্ন তাই শুধু শিক্ষার্থীর ফলাফল নয়।
প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা কি মানুষকে সুস্থ রাখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নও অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।