শিক্ষা যদি কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে মানুষ কখনোই সমাজ বুঝতে পারত না। প্রকৃত শিক্ষা ঘটে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়ায়- আলোচনায়, তর্কে, অভিজ্ঞতায়, ভুলে এবং সংশোধনে। অথচ আজকের বাস্তবতা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি যেখানে শেখা মানেই ক্লাসে বসা, সিলেবাস শেষ করা ও পরীক্ষায় ভালো করা।
প্রশ্ন তাই মৌলিক-
শিক্ষা কি সত্যিই শ্রেণিকক্ষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে? আর যদি যায়, তাহলে শেখার সামাজিক পরিসর এত সংকুচিত হলো কেন?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা ‘শিক্ষা’ আর ‘শেখা’কে এক করে ফেলেছি। শিক্ষা হয়ে উঠেছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, আর শেখা সীমাবদ্ধ হয়েছে সেই প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক গণ্ডিতে।
কিন্তু শেখা ঘটে-
পরিবারে কথোপকথনে
পাড়ায় খেলাধুলায়
বইমেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতায়
সমাজের অন্যায় দেখে প্রশ্ন তোলায়
ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কথা বলায়
এই জায়গাগুলোই ছিল শিক্ষার সামাজিক পরিসর। আজ সেগুলো ক্রমেই সঙ্কুচিত।
শেখার সামাজিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা সংস্কৃতি। যেখানে-
সময় মানে সিলেবাস শেষ করা
আলোচনা মানে সময় নষ্ট
প্রশ্ন মানে ঝামেলা
অভিজ্ঞতা মানে পাঠ্যসূচির বাইরে
ফলে শিক্ষার্থী শেখে, ক্লাসরুমের বাইরে শেখা মূল্যহীন। এই মানসিকতা তাকে সামাজিক শেখা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটি শেখাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্ক্রিনকেন্দ্রিক করে তুলেছে।
আজ শিক্ষার্থী-
অনলাইন ভিডিও দেখে
একা একা অ্যাসাইনমেন্ট করে
অ্যালগরিদমের বাছাই করা তথ্য পড়ে
কিন্তু-
আলোচনা কম
দলগত শেখা দুর্বল
বাস্তব সমাজের সঙ্গে সংযোগ সীমিত
ফলে প্রযুক্তি শেখার গতি বাড়ালেও, শেখার সামাজিক গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে।
এক সময় পরিবার ছিল শেখার প্রথম স্কুল। আজ সেখানে-
সময়ের অভাব
কর্মব্যস্ততা
সন্তানের পড়াশোনাকে শুধু রেজাল্ট হিসেবে দেখা
ফলে পরিবার প্রশ্ন করে-
“রেজাল্ট কেমন?”
কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করে-
“তুমি কী শিখলে?”
একইভাবে সমাজও আজ আর শিক্ষার সহযাত্রী নয়; বরং নীরব দর্শক।
দুঃখজনক হলেও সত্য-
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এখন সামাজিক শেখার সুযোগ সীমিত।
বিতর্ক, নাটক, সাহিত্যচর্চা প্রান্তিক
শিক্ষার্থী সংগঠন দুর্বল বা নিয়ন্ত্রিত
ভিন্নমতের চর্চা নিরুৎসাহিত
ফলে শিক্ষার্থী শেখে-
নিয়ম মানা ভালো, প্রশ্ন করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এই অভ্যাস তাকে নাগরিক হিসেবে দুর্বল করে।
বাংলাদেশে এই সংকট আরও তীব্র কারণ-
শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিরাপদ সামাজিক পরিসর কম
শহর-গ্রামে শেখার সুযোগে বৈষম্য
কোচিং-নির্ভর সংস্কৃতি
শিক্ষায় সময়ের অতিরিক্ত চাপ
ফলে শিক্ষার্থী বাস্তব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এক “পরীক্ষার্থী” হিসেবে বড় হয়।
যদি শেখা শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে-
ভালো নম্বরধারী, কিন্তু সামাজিকভাবে অনভিজ্ঞ মানুষ
তথ্যজ্ঞানসম্পন্ন, কিন্তু সহানুভূতিহীন নাগরিক
পেশাগত দক্ষ, কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চায় দুর্বল সমাজ
এটি কোনো টেকসই উন্নয়ন নয়।
শেখার সামাজিক পরিসর ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন-
পাঠ্যক্রমের বাইরে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা
স্কুল-কমিউনিটি সংযোগ
দলগত কাজ ও আলোচনা বাধ্যতামূলক করা
শিক্ষার্থী সংগঠন ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতা
পরিবারকে শেখার অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষাকে আবার মানুষকেন্দ্রিক করা।
শিক্ষা কখনোই শ্রেণিকক্ষে শেষ হওয়ার কথা নয়। শ্রেণিকক্ষ হলো শেখার সূচনা, সমাপ্তি নয়।
যদি আমরা শেখার সামাজিক পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলি, তাহলে শিক্ষা হবে সীমিত, নাগরিক হবে অসম্পূর্ণ, আর সমাজ হবে বিচ্ছিন্ন।
প্রশ্ন তাই গভীর-
আমরা কি শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি সমাজে শেখার মানুষ তৈরি করছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ।