শিক্ষা

পাঠ্যবইয়ের বাইরে শেখার প্রবণতা শূণ্যের কোঠায় নামছে, সমাধান কি?

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা সংকটে হারিয়ে যাচ্ছে শিখন-জগৎ, এ থেকে উত্তরণ জরুরি হয়েছে বহু আগেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষা কি কেবল পাঠ্যবই, সিলেবাস আর পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

এই প্রশ্নটি আজ আর তাত্ত্বিক নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বাস্তব সংকটগুলোর একটি।

কারণ বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে, বই পড়ছে, পরীক্ষা দিচ্ছে-

  • তবু শেখার গভীরতা বাড়ছে না।

  • জ্ঞান থাকছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই।

  • বোঝাপড়া হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না।

এখানেই সামনে আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন-

পাঠ্যবইয়ের বাইরে শেখার জায়গা কোথায় হারিয়ে গেল?

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা বলতে কী বোঝায়?

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা মানে এমন শেখা, যেখানে শিক্ষার্থী-

  • দেখে

  • করে

  • অনুভব করে

  • প্রতিফলনের মাধ্যমে শেখে

এটি কেবল ব্যবহারিক ক্লাস বা প্রজেক্ট নয়; এটি হলো শেখার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ।

যেখানে জ্ঞান কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

আমাদের শিক্ষা কেন বইকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যবইকেন্দ্রিকতা এসেছে কয়েকটি কারণে-

পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা

যা কেবল বইয়ের তথ্য যাচাই করে, দক্ষতা নয়।

বড় ক্লাস, সীমিত সময়

যেখানে শিক্ষক সবচেয়ে নিরাপদ পথ হিসেবে বই পড়ানোই বেছে নেন।

শিক্ষক প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদ্ধতির ঘাটতি

ফলে শিক্ষক নিজেরাও বিকল্প শেখার পদ্ধতিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

অভিভাবক ও সমাজের প্রত্যাশা

যেখানে ভালো শিক্ষা মানে ভালো ফল।

এই কাঠামোতে পাঠ্যবইই হয়ে ওঠে শেখার একমাত্র মানদণ্ড।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে শেখা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ জীবন নিজেই একটি বড় পাঠ্যবই।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে শেখা মানে-

  • সমাজকে বোঝা

  • বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়া

  • দলগত কাজ শেখা

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জন

এই অভিজ্ঞতাগুলো ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো- 

সূত্র জানে, কিন্তু সমস্যা সমাধান জানে না। ইতিহাস পড়ে, কিন্তু সমাজ বুঝতে পারে না।

বর্তমান সংকট: শেখা আছে, অভিজ্ঞতা নেই

আজকের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ-

  • মুখস্থে দক্ষ

  • পরীক্ষায় সফল

  • কিন্তু বাস্তব জীবনে অনিশ্চিত

এর কারণ,  তারা শেখে কী ভাবতে হবে, কিন্তু শেখে না কীভাবে ভাবতে হবে।

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার অভাবে-

  • সৃজনশীলতা দুর্বল হয়

  • আত্মবিশ্বাস কমে

  • সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠে না

শিক্ষা তখন কাগুজে হয়ে পড়ে।

শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা

এই সংকটের দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়।

অনেক শিক্ষক চান-

  • শ্রেণিকক্ষের বাইরে শেখাতে

  • বাস্তব উদাহরণ দিতে

  • প্রকল্পভিত্তিক কাজ করাতে

কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায়-

  • সময়সূচি

  • প্রশাসনিক চাপ

  • নির্ধারিত সিলেবাস

ফলে শিক্ষকও বন্দি হয়ে পড়েন বইয়ের ভেতরে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী শেখায়?

বিশ্বের অনেক শিক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বুঝেছে, পাঠ্যবই শেখার সূচনা হতে পারে, শেষ নয়।

তারা জোর দিচ্ছে-

  • ফিল্ডওয়ার্ক

  • সামাজিক প্রকল্প

  • কমিউনিটি লার্নিং

  • বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা

ফলে শিক্ষার্থী শুধু জানে না, বোঝে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনা কোথায়?

বাংলাদেশে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ কম নয়-

  • গ্রাম ও শহরের সামাজিক বাস্তবতা

  • পরিবেশ, কৃষি, স্বাস্থ্য, স্থানীয় অর্থনীতি

  • সংস্কৃতি ও ইতিহাস

কিন্তু এগুলো পাঠ্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।

যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো-

  • স্থানীয় সমাজকে শেখার ক্ষেত্র হিসেবে দেখে

  • পাঠ্যবইয়ের বাইরে শেখাকে মূল্যায়নের অংশ করে

তবে শেখার গভীরতা বহুগুণে বাড়তে পারে।

নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়

এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন-

  • মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার

  • শিক্ষক প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি

  • পাঠ্যক্রমে নমনীয়তা

  • অভিভাবক ও সমাজের মানসিক পরিবর্তন

শুধু স্লোগান দিয়ে এই সংকট কাটবে না।

বই প্রয়োজন, কিন্তু যথেষ্ট নয়

পাঠ্যবই শিক্ষা দেয়,কিন্তু অভিজ্ঞতা মানুষ তৈরি করে। শিক্ষা যদি কেবল বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে,

তবে আমরা হয়তো পরীক্ষায় পাশ করা প্রজন্ম পাব। কিন্তু জীবনের জন্য প্রস্তুত নাগরিক পাব না।

আজ তাই প্রশ্নটা আর “কী পড়ানো হবে” নয়। কীভাবে শেখানো হবে, এবং কোথায় শেখানো হবে।

কারণ শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে জীবনকে বুঝতে শেখায়।