একদিন সন্ধ্যার আবছা আলোয় আজরাইল আমার সামনে এসে দাঁড়ায়;
যেন মরুভূমির ক্লান্ত পথিক,
চোখে তার অনন্তের ধুলো।
সে কোনো ভয় দেখালো না; বরং কানে কানে এমন এক প্রলোভনের কথা বললো, যা এক প্রেমিকের হৃদয়ে বজ্রপাতের মতো নেমে আসে।
“ চলো, তোমার জানাজা বের হবে সেই গলি দিয়ে,
যে গলির ধুলো তুমি এতদিন বুকের তাবিজ করে রেখেছ; প্রিয়তমার দরজার সামনে দিয়ে যাবে তোমার শেষ সফর, তোমার জানাজার কাফেলা।
কথাটা শুনে আমার মনে হলো, মৃত্যু আসলে কবরের অন্ধকার নয়—এ যেন প্রেমের শেষ প্রদীপ,
যার আলোয় আত্মা একবার শেষবারের মতো প্রিয়তমার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
মনে পড়লো মির্জা গালিবের সেই দীর্ঘশ্বাসে ভেজা উপলব্ধি;
মৃত্যু নির্ধারিত, তবু মানুষ বাঁচে এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষায়; যেন পতঙ্গ জানে শিখায় পুড়বে,
তবু আগুনের দিকেই সানন্দে উড়ে যায় অবলীলায়।
আজরাইল তখনও নীরবে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখে ছিল আকাশের মতো গভীর এক রহস্য।
আমি বুঝলাম, সে আমাকে ভয় দেখিয়ে নয়,
বরং প্রেমের এক মায়াবী রূপক দেখিয়েই আমার প্রাণটি নিয়ে যাবে।
কারণ প্রেমিকের কাছে মৃত্যু কখনো শেষ নয়;
এটি কেবল আরেকটি সফর—মাটির পথ বেয়ে অনন্তের দিকে।
শেষ পর্যন্ত সে আমার প্রাণটিকে নিয়ে নিল ঠিক সেইভাবে,
যেমন বাতাস নিভিয়ে দেয় প্রদীপের শিখা—
কিন্তু শিখার উষ্ণতা কিছুক্ষণ রয়ে যায় চারপাশে।
আর আমি মনে মনে কল্পনা করতে লাগলাম—
একদিন আমার জানাজা সত্যিই সেই সরু গলি দিয়ে যাবে;
প্রিয়তমার জানালার নিচে পড়বে জানাজার ছায়া,
আর সেই ধুলোমাখা পথ তখন আমার জন্য হয়ে উঠবে এক অদৃশ্য মদিরাখানা,
যেখানে প্রেম, মৃত্যু আর স্মৃতি একাকার হয়ে যায়।
সেই মুহূর্তে মনে হলো, আজরাইল আমাকে হত্যা করেনি;
সে কেবল এক প্রেমিককে হাঁটার সুযোগ করে দিয়েছে তার সবচেয়ে প্রিয় পথ দিয়ে অনন্তের দিকে—
হায় রে গালিব, কী অবুঝ তোর আত্মমগ্ন মন!
একেই বোধ করি বলে, “অবুঝের সমীকরণ”।