একদিন আমি হাঁটছিলাম;
মনে হলো পৃথিবী নয়, যেন এক দীর্ঘ স্বপ্নের ভেতর দিয়ে হাঁটছি;
চারদিকে নীল কুয়াশা, শালিকের ডানা ছুঁয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে সন্ধ্যার আলো,
আর দূরের কোনো নদী নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে
জন্মেরও আগে ছিল যে নীরবতা, মৃত্যুর পরেও তারই পুনরাবৃত্তি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম;
মৃত্যু কি তবে শুধু অন্ধকারের দরজা?
নদী হাসলো; তার ঢেউয়ে জেগে উঠলো হাজার বছরের চাঁদের স্মৃতি;
বললো, “অন্ধকার নয়, এটি শুধু আরেকটি আকাশে পা রাখা।”
স্বপ্নের পথ তখন আরও গভীরে নিয়ে গেল আমাকে;
বনের ভিতর দিয়ে, যেখানে শুকনো পাতার ওপর হাঁটলে
মনে হয় ইতিহাসের পুরোনো দিনগুলো কেঁপে ওঠে;
যেখানে প্রতিটি গাছ জানে
কত জন্ম আর কত মৃত্যু তার ছায়ায় এসে বিশ্রাম নিয়েছে।
আমি দেখলাম;
একটি বীজ অন্ধকার মাটির ভেতরে ভেঙে পড়ছে নিঃশব্দে;
কেউ তার মৃত্যু দেখছে না,
কিন্তু সেই ভাঙনের গভীর থেকে
ধীরে ধীরে উঠে আসছে এক অঙ্কুর—সবুজ, বিস্মিত, নবজন্মের মতো।
তখন বুঝলাম—
মৃত্যু হয়তো শেষ নয়,
এ শুধু নিজের পুরোনো নামটি খুলে রেখে
অন্য এক নামের দিকে হেঁটে যাওয়া।
স্বপ্নের আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে—
তার আলোয় মনে হলো পৃথিবীর সব পথ
এক অদৃশ্য সমুদ্রের দিকে চলে যায়;
যেমন মানুষের সব জীবন
একদিন নীরবতার দিকে ফিরে যায় অবধারিতভাবে।
আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম;
কেউ কেউ মৃত্যুকে ভয় পায়
যেন তা কোনো শীতল অন্ধকার গুহা;
কিন্তু যারা গভীরভাবে জীবনকে ভালোবেসেছে,
তারা মৃত্যুর দিকে তাকায়
যেন দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে দেখা পাওয়া কোনো পরিচিত ঘরের মতো।
স্বপ্নের পথ তখন শেষের দিকে—
আকাশে হালকা বাতাস, দূরে শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুলের স্তব্ধতা;
মনে হলো পৃথিবী নিজেই এক নিঃশব্দ কবিতা
যেখানে জন্ম শুধু প্রথম পংক্তি,
আর মৃত্যু তার শেষ নয়—
বরং সেই গোপন সুর,
যেখানে কবিতার অর্থ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমি তখনও হাঁটছি,
স্বপ্নের ভেতর দিয়ে, কুয়াশার ভিতর দিয়ে, সময়ের দীর্ঘ করিডর পেরিয়ে,
আর মনে হচ্ছে,
যে মানুষ ভয় ছেড়ে মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারে
এক গভীর সমর্পণের শান্তিতে,
সে-ই একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করে,
মৃত্যুর ওপারেও আলো আছে,
নদীর ওপারেও সমুদ্র আছে,
আর জীবনের ওপারেও
এক বিস্ময়কর প্রশান্তি অপেক্ষা করে;
যাকে আমরা মৃদু বিস্ময়ে, ধীর কণ্ঠে
জীবনানন্দ বলে ডাকি।