শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুতে সংস্কার পরিকল্পনা, শিক্ষক ও প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর: ববি হাজ্জাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জনগণের আস্থা ও দায়িত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব শুধুমাত্র একটি পদ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তিনি বলেন, ঢাকা-১৩ আসনের ভোটাররা তাঁকে নির্বাচিত করে যে আস্থা রেখেছেন, তার প্রতিদান দিতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বেসরকারি টেলিভিশন, ‘চ্যানেল আই’- এর জনপ্রিয় টকশো ‘ভিন্নমতে সহমত’- এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার মুহূর্তে তিনি প্রথমেই আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর তার ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এই ভিত্তি দুর্বল হলে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁর ভাষায়, “প্রথম পাঁচ বছরে যদি সঠিকভাবে শেখানো না যায়, তাহলে পরবর্তী ১২–১৬ বছরের শিক্ষাও কার্যকর হয় না।”

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৮-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক শিক্ষায় ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলোা, এই শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণে নানা পদক্ষেপ এবং সংস্কার প্রয়োজন এমন দিকগুলো তুলে ধরেন তিনি-

শিক্ষক ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার বড় কারণ হিসেবে তিনি শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়ন, এই তিন জায়গাতেই আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।”

নতুন পরিকল্পনায় শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং তাদের উৎসাহিত করার জন্য আধুনিক ইনসেনটিভ কাঠামো চালুর কথা জানান তিনি।

শহর-গ্রাম বৈষম্য কমাতে উদ্যোগ

প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন, শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। শহরে ভালো শিক্ষক পাওয়া গেলেও গ্রামে অনেক স্কুলে শিক্ষক সংকট প্রকট। কোথাও ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এই সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণোদনা কাঠামো পরিবর্তন এবং সহজতর কিন্তু কার্যকর পাঠ্যক্রম প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা

ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, একটি সমন্বিত লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভিডিও ক্লাস, লেসন এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে শেখার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং অভিভাবকদেরও নিয়মিত আপডেট দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “প্রযুক্তি ব্যবহার মানেই শুধু ডিভাইস দেওয়া নয়, বরং সেটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।” এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।

কোচিং নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য

প্রতিমন্ত্রী জানান, ধাপে ধাপে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। এক্ষেত্রে ২-৩ বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে, যাতে শিক্ষার্থীরা মূলধারার শিক্ষার মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

একক কারিকুলামের আওতায় সব মাধ্যম

তিনি আরও বলেন, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা, সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কারিকুলামের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দক্ষতা, সিভিক এডুকেশন ও মূল্যবোধে জোর

নতুন শিক্ষানীতিতে ভাষা, গণিত, যোগাযোগ দক্ষতা ও নাগরিক মূল্যবোধ (civic education)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাঁচ বছরে বড় পরিবর্তনের আশাবাদ

প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে প্রাথমিক শিক্ষায় “আকাশ-পাতাল পরিবর্তন” আনা সম্ভব। তিনি জানান, বাজেট বাস্তবায়নের হার নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মানকেই এখন প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্যোগ

তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সবাই সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ পায়।

সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব

শেষে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত লাভের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের কল্যাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। “আপনার কাজের প্রভাব আশপাশের মানুষের ওপর কেমন পড়ছে, সেটা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে”।

সার্বিকভাবে, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন, প্রযুক্তির সংযোজন এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।