বিনোদন

Killers of the Flower Moon: লোভ, ক্ষমতা ও নীরব গণহত্যার এক ভয়ংকর দলিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্টিন স্করসেজি যখন কোনো সিনেমা বানান, তা কেবল গল্প বলা নয়, ইতিহাস, রাজনীতি ও মানবিক সংকটকে উন্মোচনের এক শিল্পিত প্রয়াস।

Killers of the Flower Moon ঠিক তেমনই একটি চলচ্চিত্র। এটি কোনো সাধারণ ক্রাইম ড্রামা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা এক ভয়াবহ অধ্যায়ের নির্মম দলিল।

সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত ভয়ংকর আখ্যান

সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে ১৯২০-এর দশকের যুক্তরাষ্ট্রে, Osage Nation নামের এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঘিরে। তেলের খোঁজে রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠা এই জনগোষ্ঠীই পরিণত হয় শোষণ, প্রতারণা ও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের শিকার। রাষ্ট্র, তুলে ধরা হয়েছে- যেখানে আইন, শ্বেতাঙ্গ ক্ষমতা ও পুঁজির যোগসাজশে একের পর এক আদিবাসী মানুষ নিশ্চুপে খুন হয়ে যায়।

স্করসেজির নির্মাণ: নীরবতা দিয়েই সবচেয়ে জোরালো আঘাত

স্করসেজি এখানে চিৎকার করে গল্প বলেননি। বরং ধীরগতির, স্তব্ধ ও ভারী আবহে তিনি দর্শককে অপরাধের ভেতরে টেনে নিয়ে গেছেন। সিনেমার দীর্ঘ দৈর্ঘ্য কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এই সময়টাই দর্শককে বোঝায়- এই সহিংসতা হঠাৎ নয়, এটি ছিল পরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক।

অভিনয়: চরিত্রের ভেতর ঢুকে যাওয়া পারফরম্যান্স

লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও এখানে নায়ক নন, আবার সরাসরি খলনায়কও নন।

তার চরিত্র Ernest Burkhart এক ভীতু, লোভী ও নৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ, যার ভেতরের দ্বন্দ্ব সিনেমার অন্যতম শক্তি।

রবার্ট ডি নিরো ভয় দেখান চিৎকারে নয়, বরং ঠান্ডা হাসিতে।

William Hale চরিত্রে তিনি ক্ষমতার নীরব নিষ্ঠুরতার প্রতীক।

তবে সিনেমার আত্মা হয়ে উঠেছেন লিলি গ্ল্যাডস্টোন। তার অভিনয় সংযত, গভীর ও হৃদয়বিদারক। এক নিপীড়িত নারীর নীরব যন্ত্রণা তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দীর্ঘদিন দর্শকের মনে থেকে যায়।

সিনেমাটোগ্রাফি ও সংগীত: সৌন্দর্যের আড়ালে অমানবিকতা

চিত্রগ্রহণে গ্রাম্য আমেরিকার সৌন্দর্য আর তার নিচে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতা একসঙ্গে ধরা পড়েছে। রব্বি রবার্টসনের সংগীত অতিনাটকীয় নয়, বরং শোক ও অশনি সংকেতের মতো ধীরে ধীরে গল্পকে ঘিরে ধরে।

কেবল অতীত নয়, বর্তমানের প্রশ্ন

Killers of the Flower Moon কেবল ইতিহাসের সিনেমা নয়। এটি প্রশ্ন তোলে-

  • রাষ্ট্র কাদের নিরাপত্তা দেয়?

  • পুঁজির সামনে মানবজীবনের মূল্য কতটুকু?

  • আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কীভাবে বারবার চাপা পড়ে যায়?

এই প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক, যা সিনেমাটিকে সময় ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

সীমাবদ্ধতা নয়, বরং চ্যালেঞ্জ

কিছু দর্শকের কাছে সিনেমার দীর্ঘ সময় ও ধীর গতি চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে।

কিন্তু এটি আসলে গল্পের প্রয়োজন, কারণ গণহত্যার ভয়াবহতা বোঝাতে তাড়াহুড়া করা যায় না।

রেটিংয়ের বাইরে অবস্থান

Internet Movie Database- এর রেটিং অনুযায়ী ৭.৫ স্কোর থাকলেও, দর্শক ও ভক্তবৃন্দের কাছে এই সিনেমা নম্বর বা রেটিংয়ের জন্য নয়।

এটি দেখার পর দর্শক বিনোদিত কম, বিচলিত বেশি হবে, এটাই নির্মাতার সাফল্য।

Killers of the Flower Moon একটি সাহসী, অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যন্ত জরুরি সিনেমা। এটি দেখিয়ে দেয়, ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধগুলো অনেক সময় ঘটে নিঃশব্দে, আইনের ছায়াতলে।

বিনোদনের বাইরেও যে সিনেমা সমাজের আয়না হতে পারে- এই চলচ্চিত্র তার শক্ত প্রমাণ।

এই সিনেমা দেখা উচিত, কারণ কিছু গল্প উপভোগের জন্য নয়, মনে রাখার জন্য তৈরি হয়।