প্রবাস

রিক্রুটিং ব্যবসা: মানবপাচার আর বৈধ অভিবাসনের মাঝখানে ধূসর এলাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখানো হয় পোস্টার, ফেসবুক বিজ্ঞাপন আর দালালের মুখে মুখে।

বলা হয়-  “ভিসা রেডি”, “চুক্তি ফিক্সড”, “বেতন ইউরোপের মতো।” কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে বহু প্রবাসীর উপলব্ধি হয়, যে পথে তারা এসেছে, সেটি পুরোপুরি বৈধও নয়, আবার সরাসরি মানবপাচারও নয়।

এই মাঝখানের জায়গাটিই আজকের সবচেয়ে বিপজ্জনক বাস্তবতা, রিক্রুটিং ব্যবসার ধূসর এলাকা।

এই ধূসরতা বুঝতে না পারাই হাজার হাজার প্রবাসীকে ঠেলে দেয় শোষণ, অবৈধতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে।

রিক্রুটিং ব্যবসা কীভাবে বৈধ হলো?

বিদেশে শ্রম পাঠানো রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত একটি খাত।

লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সি, সরকার টু সরকার (G2G) চুক্তি, মেডিকেল, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, সব মিলিয়ে এটি একটি বৈধ অভিবাসন কাঠামো।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় এখানেই-

এই বৈধ কাঠামোর ভেতরেই গড়ে উঠেছে একটি সমান্তরাল অনানুষ্ঠানিক বাজার, যেখানে-

  • সাব-এজেন্ট বা দালাল কাজ করে

  • চুক্তি বদলে যায় মুখে মুখে

  • খরচ বাড়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে

  • দায় কেউ নেয় না

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল, এই শূন্যস্থানেই ধূসরতার জন্ম।

মানবপাচার আর রিক্রুটিংয়ের পার্থক্য কোথায় ঝাপসা হয়?

মানবপাচার সাধারণত জোরপূর্বক, প্রতারণা বা শোষণের উদ্দেশ্যে মানুষ পরিবহনকে বোঝায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রবাসীর অভিজ্ঞতা এমন-

  • তারা স্বেচ্ছায় গেছে

  • কাগজপত্র ছিল

  • ভিসা বৈধ ছিল

তবু-

  • গন্তব্যে গিয়ে কাজ বদলে গেছে

  • বেতন কমে গেছে

  • পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে

  • কাজ ছাড়তে চাইলে হুমকি দেওয়া হয়েছে

আইনি ভাষায় এটি হয়তো সরাসরি মানবপাচার নয়, কিন্তু মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার বিবেচনায় এটি পাচারের মতোই শোষণমূলক।

দালাল নেটওয়ার্ক: অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী

রিক্রুটিং ব্যবসার সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো দালাল নেটওয়ার্ক। তারা-

  • গ্রাম থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে

  • লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির নাম ব্যবহার করে

  • অতিরিক্ত টাকা তোলে

  • কোনো লিখিত দায় নেয় না

দালালরা আইনের চোখে প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে তারাই পুরো ব্যবস্থার চালক।

ঋণের শেকল: শোষণের নীরব অস্ত্র

অধিকাংশ প্রবাসী বিদেশ যেতে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়। এই ঋণই পরে হয়ে ওঠে শোষণের হাতিয়ার।

কম বেতনে কাজ করলেও চাকরি ছাড়তে পারে না

  • নির্যাতন সহ্য করে

  • অবৈধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি নেয়

একে বিশেষজ্ঞরা বলেন Debt Bondage, যা আন্তর্জাতিকভাবে আধুনিক দাসত্বের একটি রূপ হিসেবে স্বীকৃত।

রাষ্ট্রের ভূমিকা: নিয়ন্ত্রক না নীরব দর্শক?

বাংলাদেশে আইন আছে- মানবপাচার প্রতিরোধ আইন, রিক্রুটিং লাইসেন্স নীতিমালা। কিন্তু বাস্তবে-

  • লাইসেন্স বাতিলের নজির কম

  • ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ দুর্বল

  • অভিযোগ প্রক্রিয়া জটিল

  • প্রবাসে দূতাবাসের সমন্বয় সীমিত

ফলে রিক্রুটিং ব্যবসা প্রায় জবাবদিহিহীন লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে।

গন্তব্য দেশের দায় এড়ানোর কৌশল

গন্তব্য দেশগুলোও অনেক সময় দায় এড়িয়ে যায়। তারা বলে-

  • শ্রমিক এসেছে বৈধ পথে

  • নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে

কিন্তু নিয়োগকর্তার শোষণ, পাসপোর্ট আটকে রাখা বা চুক্তি ভঙ্গ, এসব দেখেও ব্যবস্থা নেয় না। কারণ এতে শ্রমবাজার সস্তা থাকে।

নারী শ্রমিক ও রিক্রুটিং: সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র

গৃহকর্মী নারীরা রিক্রুটিং ধূসরতার সবচেয়ে বড় শিকার।

  • চুক্তি থাকে না

  • কাজের সময়সীমা নির্দিষ্ট নয়

  • নির্যাতন থেকে পালালে অবৈধ হয়ে পড়ে

এখানে রিক্রুটিং প্রায় মানবপাচারের কাছাকাছি চলে যায়।

সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূসর এলাকা দূর করতে প্রয়োজন-

  • সাব-এজেন্ট ব্যবস্থা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ

  • রিক্রুটিং ফি শূন্য বা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত

  • বাধ্যতামূলক ডিজিটাল চুক্তি

  • গন্তব্য দেশে চাকরি বদলের অধিকার

  • দূতাবাসে শক্তিশালী লেবার প্রটেকশন ইউনিট

  • ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের জন্য দ্রুত আইনি সহায়তা

সবচেয়ে জরুরি- রিক্রুটিংকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা, কেবল ব্যবসা হিসেবে নয়।

শেষ কথা

রিক্রুটিং ব্যবসা নিজে কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যখন লাভের খাতিরে মানুষকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন সেটি মানবপাচারের কাছাকাছি চলে যায়। বৈধ অভিবাসন আর মানবপাচারের মাঝখানে যে ধূসর এলাকা তৈরি হয়েছে, সেটিই আজ প্রবাসী শোষণের প্রধান উৎস।

এই ধূসরতা ভাঙা না গেলে, প্রবাসীর স্বপ্ন বারবার দুঃস্বপ্নে রূপ নেবে- আইনের চোখে বৈধ হয়েও বাস্তবে মানবিকভাবে অবৈধ হয়ে।