বিদেশে কাজ করা একজন প্রবাসীর কাছে স্বাস্থ্যবিমা যেন নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। চাকরির কাগজে লেখা থাকে, Medical Insurance Covered। কিন্তু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে সেই প্রতিশ্রুতি অনেক সময় কাগজেই আটকে থাকে। বাস্তবে দেখা যায়, বিমা থাকলেও চিকিৎসা মিলছে না, অথবা মিলছে শর্ত, বিলম্ব আর জটিলতার দেয়ালে আটকে।
এই বৈপরীত্যই আজ বহু প্রবাসীর অভিন্ন অভিজ্ঞতা- স্বাস্থ্যবিমা আছে, কিন্তু চিকিৎসা অধরা। কেন?
অধিকাংশ গন্তব্য দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক। নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির মাধ্যমে বিমা করা হয়। কিন্তু এই বিমাগুলোর বড় অংশই ন্যূনতম কভারেজভিত্তিক, যার লক্ষ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা নয়, বরং আইনি দায় এড়ানো।
ফলে-
জরুরি চিকিৎসা ছাড়া অনেক সেবা কভার করে না
দীর্ঘমেয়াদি রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য বা পুনর্বাসন বাদ পড়ে
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ দেখাতে অতিরিক্ত অনুমতির প্রয়োজন হয়
অসুস্থ শ্রমিক তখন বিমার কাগজ হাতে নিয়ে চিকিৎসার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে ঢুকতে পারে না।
স্বাস্থ্যবিমার সবচেয়ে বড় বাধা হলো পূর্বানুমোদন (Pre-authorization) প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে-
ডাক্তার চিকিৎসা দিতে চাইলেও বিমা কোম্পানির অনুমতি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা
অনুমতি পেতে দিন বা সপ্তাহ লেগে যায়
জরুরি নয়, এই যুক্তিতে আবেদন বাতিল
এই বিলম্ব অনেক সময় রোগকে জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি চিকিৎসাগত ঝুঁকি।
বেশিরভাগ বিমা কেবল নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক হাসপাতাল গ্রহণ করে। কিন্তু-
শ্রমিকের কর্মস্থল থেকে এসব হাসপাতাল অনেক দূরে
জরুরি অবস্থায় নিকটবর্তী হাসপাতালে গেলে বিমা কার্যকর হয় না
ছোট শহর বা শ্রমিক ক্যাম্প এলাকায় নেটওয়ার্ক হাসপাতাল নেই
ফলে বাস্তবে বিমা থাকলেও চিকিৎসার দরজা বন্ধ থাকে।
স্বাস্থ্যবিমা সংক্রান্ত শর্তাবলি সাধারণত জটিল ভাষায় লেখা থাকে, যা অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক পুরোপুরি বোঝেন না।
কোন রোগ কভার করে, কোনটা করে না তা স্পষ্ট নয়
কিভাবে ক্লেইম করতে হবে, জানা নেই
কোথায় অভিযোগ করতে হবে, তাও অস্পষ্ট
এই তথ্যগত বৈষম্য প্রবাসী শ্রমিককে কাঠামোগতভাবে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়োগকর্তা বিমা প্রিমিয়াম ন্যূনতম রাখার জন্য কম কভারেজ নেয়।
অসুস্থ শ্রমিক কাজে অক্ষম হয়ে পড়লে-
চিকিৎসা বিলম্বিত হয়
দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়
বিমা ক্লেইমে সহযোগিতা করা হয় না
এতে বিমা থাকা সত্ত্বেও শ্রমিক কার্যত চিকিৎসাবিহীন হয়ে পড়ে।
প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা- ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, ট্রমা, অধিকাংশ বিমার আওতার বাইরে।
অথচ পরিবার থেকে দূরে থাকা, কাজের চাপ ও অনিশ্চয়তা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আধুনিক স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
গন্তব্য দেশে স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে-
বিমার মান ও কভারেজ যাচাই হয় না
অভিযোগ ব্যবস্থাপনা দুর্বল
দূতাবাসে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সহায়তা সীমিত
ফলে প্রবাসীরা দ্বৈত অবহেলার শিকার হয়, নিয়োগকর্তা ও রাষ্ট্র, দু’দিক থেকেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা বিমা ব্যবস্থায় নয়, সমস্যা বাস্তবায়নের কাঠামোয়। সমাধানে প্রয়োজন-
ন্যূনতম মানসম্পন্ন বিমা প্যাকেজ বাধ্যতামূলক করা
প্রি-অথরাইজেশন প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা
মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা
দূতাবাসে স্বাস্থ্য সহায়তা ডেস্ক চালু
প্রবাসীদের জন্য সহজ ভাষায় বিমা তথ্য প্রদান
স্বাস্থ্যবিমা থাকার অর্থ চিকিৎসা পাওয়া নয়, যদি সেই বিমা কেবল আইনি আনুষ্ঠানিকতা হয়। প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা তখনই অর্থবহ হবে, যখন অসুস্থতায় হাসপাতালের দরজা সত্যিকার অর্থে খুলে যাবে।
প্রবাসীরা কেবল শ্রমিক নন, তারা মানুষ। এবং চিকিৎসা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি মৌলিক অধিকার