বিদেশে জীবনের অধ্যায় শেষ হয় সাধারণত হঠাৎ করেই। কখনো কাজ হারিয়ে, কখনো ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে, কখনো শরীর আর সঙ্গ দেয় না, আবার কখনো পরিবার টানে দেশে। পরিকল্পনা করে ফেরেন খুব কম প্রবাসীই। অধিকাংশের ফেরাটা হয় অপ্রস্তুত, অনিশ্চিত আর মানসিকভাবে ভাঙা অবস্থায়।
এই ফেরার পরই সামনে আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন-
বিদেশে জীবন শেষ হলে, দেশে কি সত্যিই নতুন করে শুরু করা সম্ভব?
সামাজিকভাবে ফেরত প্রবাসী মানেই যেন দুই চরম ছবি-
একদিকে সফল প্রবাসী, যিনি বাড়ি করেছেন, ব্যবসা শুরু করেছেন;
অন্যদিকে ‘কিছু করতে না পেরে’ ফেরা মানুষ।
বাস্তবে ফেরত প্রবাসীরা এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকেন।
তাদের আছে-
বিদেশের কাজের অভিজ্ঞতা
কিছু সঞ্চয় (বা ঋণ)
কিন্তু নেই স্পষ্ট পুনর্বাসন পথ
ফলে নতুন শুরুটা স্বপ্নের মতো সহজ হয় না।
বিদেশ ফেরার পর প্রথম ধাক্কা আসে অর্থনীতিতে।
সঞ্চয় দ্রুত ফুরিয়ে যায়
আয় বন্ধ, কিন্তু খরচ চলমান
পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা চাপ তৈরি করে
অনেক ফেরত প্রবাসী প্রথম এক বছরের মধ্যেই বুঝে যান, বিদেশে কষ্ট করে জমানো টাকা দেশে এসে টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রবাসে কাজ করে অনেকেই অর্জন করেন-
নির্মাণ দক্ষতা
মেশিন অপারেশন
হোটেল বা সার্ভিস অভিজ্ঞতা
কিন্তু দেশে এসে দেখেন-
এই দক্ষতার স্বীকৃতি নেই
সনদ নেই, সার্টিফিকেশন নেই
স্থানীয় বাজারে চাহিদা কম
ফলে বিদেশে শেখা দক্ষতা দেশে এসে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
ফেরত প্রবাসীদের বড় অংশ ভোগেন-
আত্মসম্মানবোধের ক্ষয়
ব্যর্থতার গ্লানি
সিদ্ধান্তহীনতা ও হতাশা
কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার জায়গা নেই। পরিবারও অনেক সময় বলে-
“বিদেশ থেকে এসেছ, এখন ঠিক হয়ে যাবে।”
এই ‘ঠিক হয়ে যাবে’ কথাটাই অনেককে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ফেরত প্রবাসীদের জন্য আছে-
ঋণ কর্মসূচি
প্রশিক্ষণ প্রকল্প
পুনর্বাসনের ঘোষণা
কিন্তু বাস্তবে-
তথ্য পৌঁছায় না
প্রক্রিয়া জটিল
স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় নেই
ফলে নীতিগুলো কাগজেই থেকে যায়, মানুষের জীবনে পৌঁছায় না।
বিদেশ থেকে ফেরা মানেই সামাজিক চোখে পরীক্ষায় পড়া।
“কত টাকা আনছ?”
“আবার বিদেশ যাবি না?”
“দেশে কিছু করা যায় নাকি?”
এই প্রশ্নগুলো ফেরত প্রবাসীর আত্মবিশ্বাস আরও দুর্বল করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে- সম্ভব, কিন্তু বর্তমান কাঠামোয় কঠিন।
নতুন শুরু সম্ভব তখনই, যখন-
ফেরার আগে পরিকল্পনা থাকে
সঞ্চয়ের সঠিক ব্যবহার হয়
দক্ষতার স্বীকৃতি ও বাজার সংযোগ থাকে
রাষ্ট্রীয় সহায়তা মাঠে কার্যকর হয়
ব্যতিক্রমী সাফল্যের গল্প আছে, কিন্তু তা নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম।
ফেরত প্রবাসীরা হতে পারেন-
স্থানীয় উদ্যোক্তা
দক্ষ প্রশিক্ষক
বিদেশফেরত অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক কনসালট্যান্ট
কিন্তু এজন্য দরকার-
স্কিল ম্যাপিং
সহজ ঋণ ও পরামর্শ
সামাজিক স্বীকৃতি
অর্থাৎ ফেরত প্রবাসীকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখা।
কারণ-
তারা সংগঠিত নন
রাজনৈতিকভাবে দুর্বল
নীতিনির্ধারণের টেবিলে জায়গা নেই
ফলে পুনর্বাসন নীতি হয় দূর থেকে বানানো, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নয়।
বিদেশে জীবন শেষ হওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়। কিন্তু দেশে নতুন শুরু আপনা-আপনি হয় না। এটি একটি পরিকল্পিত, নীতিনির্ভর ও মানবিক প্রক্রিয়া।
একটি রাষ্ট্র যদি তার প্রবাসীদের প্রতি দায়বদ্ধ হয়, তবে তাকে নিশ্চিত করতে হবে-
বিদেশ থেকে ফেরা মানেই শূন্যে ফেরা নয়।
নতুন শুরু তখনই সম্ভব, যখন ফেরত প্রবাসী একা নয়, রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়ায়।