প্রবাস

বিদেশে গিয়ে পেশা বদল: ডিগ্রিধারীরা কেন নির্মাণশ্রমিক হচ্ছেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের হাজারো তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষে যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তখন পরিবারের স্বপ্ন থাকে- তিনি হয়তো ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যাংকার কিংবা আইটি পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন।

কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চিত্র প্রায়ই ভিন্ন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া অনেক তরুণই বিদেশে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্মাণশ্রমিক, ওয়্যারহাউস কর্মী, ডেলিভারি রাইডার কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজার, শিক্ষা কাঠামো, দক্ষতার ঘাটতি, অভিবাসন নীতি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সংকটের একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা।

বর্তমান বিশ্বে অভিবাসন আর শুধু “বিদেশে যাওয়া”র প্রশ্ন নয়; বরং “কোন দক্ষতা নিয়ে কোন বাজারে প্রবেশ করা হচ্ছে”, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই: সমস্যার মূল কোথায়?

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি দুর্বলতা হলো- ডিগ্রি কেন্দ্রিকতা।

অর্থাৎ, চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে একজন শিক্ষার্থী হয়তো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, যেমন-

  • পেশাগত ভাষাজ্ঞান

  • প্রযুক্তিগত সক্ষমতা

  • আন্তর্জাতিক মানের সফট স্কিল

  • লাইসেন্স বা সার্টিফিকেশন

  • ডিজিটাল ও কারিগরি দক্ষতা

-এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকছেন।

বিদেশের নিয়োগদাতারা মূলত “কাজের সক্ষমতা” মূল্যায়ন করেন, শুধু একাডেমিক ডিগ্রি নয়।

ফলে, বাংলাদেশের অনেক ডিগ্রিধারী বিদেশে গিয়ে নিজের শিক্ষাগত পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পান না।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকট: ডিগ্রি কেন গ্রহণযোগ্য হয় না?

বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেশে গ্রহণযোগ্য হলেও বিদেশে তা সরাসরি সমমান পায় না।

বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা উন্নত এশীয় দেশগুলোতে অনেক পেশায় কাজ করতে হলে প্রয়োজন হয়-

  • স্থানীয় লাইসেন্স

  • পেশাগত পরীক্ষা

  • ভাষাগত যোগ্যতা

  • অভিজ্ঞতার প্রমাণ

  • নির্দিষ্ট দেশের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ

ফলে বাংলাদেশে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিদেশে গিয়ে হয়তো নির্মাণসাইটে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, কারণ তার ডিগ্রি সেই দেশে পেশাগতভাবে স্বীকৃত নয়।

একইভাবে অনেক শিক্ষক, নার্স, ফার্মাসিস্ট বা আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিও বিদেশে গিয়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন।

এখানে একটি বড় বাস্তবতা হলো- “ডিগ্রি” এবং “পেশাগত লাইসেন্স” এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশে এই পার্থক্য সম্পর্কে সচেতনতা এখনও খুব সীমিত।

ভাষা দক্ষতা: সবচেয়ে বড় অদৃশ্য বাধা

অনেক প্রবাসী শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভালো চাকরি পান না শুধুমাত্র ভাষাগত দুর্বলতার কারণে।

বিশেষ করে-

  • ইংরেজিতে পেশাগত যোগাযোগ দক্ষতা

  • আরবি ভাষা

  • ইতালিয়ান, জার্মান বা ফরাসি ভাষা

  • ইন্টারভিউ দক্ষতা

-এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেন না।

বিদেশে শুধু কাজ জানাই যথেষ্ট নয়; কাজ বোঝানো, নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ, দলগত যোগাযোগ এবং গ্রাহকের সঙ্গে আচরণ, সবকিছুই ভাষার ওপর নির্ভর করে।

ফলে, কম দক্ষ শ্রমভিত্তিক কাজে প্রবেশ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে পড়ে।

বিদেশে শ্রমবাজারের বাস্তবতা: দক্ষতার চেয়ে প্রয়োজন বড়

মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা কিছু ইউরোপীয় দেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ অভিবাসী প্রথমেই যে খাতে সুযোগ পান, তা হলো-

  • নির্মাণশ্রম

  • রোড ও অবকাঠামো কাজ

  • পরিষেবা খাত

  • গুদাম ও লজিস্টিকস

  • কৃষি শ্রম

  • ডেলিভারি ও পরিবহন

কারণ এসব খাতে দ্রুত কর্মী প্রয়োজন হয় এবং প্রবেশের শর্ত তুলনামূলক কম।

অন্যদিকে পেশাজীবী খাতে প্রবেশ করতে হলে দীর্ঘ যাচাই, লাইসেন্স, ভাষা পরীক্ষা এবং অভিজ্ঞতার প্রমাণ লাগে।

ফলে আর্থিক চাপে থাকা অভিবাসীরা অপেক্ষা না করে দ্রুত আয় নিশ্চিত করতে যেকোনো কাজ গ্রহণ করেন।

অর্থনৈতিক চাপ: স্বপ্ন নয়, টিকে থাকার লড়াই

বিদেশে যাওয়ার পেছনে অনেক পরিবারকে-

  • জমি বিক্রি করতে হয়

  • ঋণ নিতে হয়

  • দালালকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়

  • সুদে অর্থ ধার করতে হয়

ফলে, বিদেশে পৌঁছানোর পর একজন অভিবাসীর সামনে প্রথম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়- যেভাবেই হোক দ্রুত আয় শুরু করা। তিনি হয়তো জানেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে কাজটির মিল নেই, কিন্তু মাস শেষে টাকা পাঠানোই তখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

এই অর্থনৈতিক চাপই অনেক শিক্ষিত তরুণকে স্বপ্নের পেশা থেকে সরিয়ে কঠিন শ্রমভিত্তিক কাজে ঠেলে দেয়।

সামাজিক বাস্তবতা: দেশে “ইঞ্জিনিয়ার”, বিদেশে “লেবার”

বাংলাদেশি সমাজে বিদেশে যাওয়াকে এখনও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রবাসজীবনের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কম।

ফলে, অনেকেই সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রকৃত কাজের ধরন গোপন রাখেন। এমনও দেখা যায় যে, দেশে পরিবার জানে তিনি “অফিসে কাজ করেন”, অথচ বাস্তবে তিনি নির্মাণসাইটে কাজ করছে।

এই দ্বৈত বাস্তবতা থেকে তৈরি হয়-

  • মানসিক চাপ

  • আত্মপরিচয়ের সংকট

  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

  • হতাশা ও অবসাদ

বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য এটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

স্কিল মিসম্যাচ: বাংলাদেশের বড় কাঠামোগত সংকট

বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সাধারণ ডিগ্রি অর্জন করছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সেই শিক্ষার সামঞ্জস্য কম।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে যে দক্ষতাগুলোর চাহিদা বাড়ছে-

  • কেয়ারগিভিং

  • স্বাস্থ্য সহায়তা

  • অটোমেশন ও মেশিন অপারেশন

  • ওয়েল্ডিং ও টেকনিক্যাল ট্রেড

  • আইটি ও সাইবার সাপোর্ট

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি

  • বৃদ্ধসেবা ও মেডিকেল সহকারী

-সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারেনি।

অন্যদিকে সাধারণ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের মানসম্মত সুযোগ বাড়েনি।

দালালনির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থাও বড় কারণ

অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীরা বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরি সম্পর্কে সঠিক তথ্যই পান না।

দালাল বা অননুমোদিত এজেন্সি প্রায়ই-

  • ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি দেয়

  • বেতনের ভুল তথ্য দেয়

  • পেশাগত কাজের আশ্বাস দেয়

  • বাস্তব চুক্তিপত্র গোপন রাখে

ফলে বিদেশে গিয়ে দেখা যায় বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রক্রিয়া দক্ষ জনশক্তিকেও অদক্ষ শ্রমবাজারে ঠেলে দিচ্ছে।

উন্নত দেশগুলো এখন কী চায়?

বিশ্বের অনেক দেশ এখন “স্মার্ট মাইগ্রেশন” নীতিতে যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা শুধু শ্রমিক নয়, নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী চায়।

বিশেষ করে ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে-

  • ভাষা দক্ষতা

  • টেকনিক্যাল সার্টিফিকেশন

  • অভিজ্ঞতা

  • স্বাস্থ্য ও কেয়ার সেক্টর দক্ষতা

  • ডিজিটাল সক্ষমতা

অর্থাৎ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে শুধু ডিগ্রি দিয়ে টিকে থাকা আরও কঠিন হবে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?

১. শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারমুখী করা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক চাহিদার সমন্বয় প্রয়োজন।

২. আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ

টিভেট ও টেকনিক্যাল শিক্ষা আধুনিকায়ন জরুরি।

৩. ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা

বিদেশগামী কর্মীদের জন্য পেশাভিত্তিক ভাষা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

৪. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা

বিদেশি পেশাগত সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সার্টিফিকেশন কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।

৫. দালালনির্ভরতা কমানো

স্বচ্ছ ও ডিজিটাল অভিবাসন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা জরুরি।

৬. “ডিগ্রি বনাম দক্ষতা” মানসিকতা পরিবর্তন

সমাজে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক পেশার মর্যাদা বাড়াতে হবে।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন

আগামী বিশ্বে অভিবাসনের ধরন দ্রুত বদলাবে। এআই, অটোমেশন এবং স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রি কম দক্ষ শ্রমের চাহিদা কমিয়ে দেবে।

তখন শুধু বিদেশে যাওয়া নয়, “কোন দক্ষতা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে”, সেটিই নির্ধারণ করবে একজন অভিবাসীর ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশ যদি এখনও শুধু জনশক্তি রপ্তানির চিন্তায় আটকে থাকে, তাহলে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ বিদেশে গিয়ে নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করতেই বাধ্য হবেন।

অন্যদিকে এখনই যদি দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মান এবং বাস্তবমুখী শিক্ষায় বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে “নির্মাণশ্রমিক” নয়, বাংলাদেশি তরুণরা বিশ্ববাজারে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবেন।