দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান পরিচয় ছিল, অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রম রপ্তানিকারক দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণক্ষেত্র, পরিষেবা খাত কিংবা গৃহকর্ম- এসব জায়গায় বাংলাদেশি শ্রমিক মানেই কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর সীমিত অধিকার। কিন্তু বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন চাহিদা দক্ষতা, সার্টিফিকেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমের।
এই বাস্তবতায় বড় প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, অদক্ষ শ্রম থেকে দক্ষ মাইগ্রেশনের দিকে যেতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চরিত্র পাল্টে দিয়েছে। উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো এখন এমন কর্মী চায়, যারা-
নির্দিষ্ট স্কিলের সার্টিফিকেশনধারী
ভাষাগতভাবে প্রস্তুত
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড জানে
উৎপাদনশীলতা ও মান বজায় রাখতে সক্ষম
এই বাস্তবতায় অদক্ষ শ্রমের চাহিদা কমছে, আর দক্ষ শ্রমের মূল্য বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি এখনো সংখ্যার ওপর জোর দেয়, দক্ষতার ওপর নয়, তাহলে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে টিকে থাকাই কঠিন হবে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠায়। কিন্তু তাদের বড় অংশই-
স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণবিহীন
ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতায় পিছিয়ে
ফলে তারা কম বেতনের চাকরিতে আটকে পড়ে। একই কাজ অন্য দেশের স্কিলড কর্মী করলে যেখানে দ্বিগুণ বা তিনগুণ আয় হয়, সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক পায় ন্যূনতম মজুরি। এটি কেবল শ্রমিকের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় আয়ের সম্ভাবনার অপচয়।
স্কিলড মাইগ্রেশন মানে শুধু ডিগ্রিধারী পাঠানো নয়। এর অর্থ-
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রেড স্কিল
স্ট্যান্ডার্ডভিত্তিক প্রশিক্ষণ
ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি
পেশাগত লাইসেন্স ও সার্টিফিকেশন
নার্স, কেয়ারগিভার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, আইটি টেকনিশিয়ান, হেলথ টেকনোলজিস্ট—এসব পেশায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে?
বাংলাদেশে কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে প্রতিষ্ঠান আছে, প্রকল্প আছে, বাজেটও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো-
প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
সার্টিফিকেশন অনেক দেশে স্বীকৃত নয়
প্রশিক্ষণ আর বাস্তব চাকরির মধ্যে সংযোগ দুর্বল
প্রশিক্ষণ শেষেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই
ফলে দক্ষতা অর্জন করেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত অদক্ষ শ্রমের চাকরিতেই বিদেশ যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রিক্রুটিং ব্যবসা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। রিক্রুটাররা সংখ্যাভিত্তিক শ্রমিক পাঠাতে আগ্রহী, স্কিলড শ্রমিক তৈরি করতে নয়। কারণ-
অদক্ষ শ্রমিক দ্রুত পাঠানো যায়
খরচ কম
জবাবদিহি কম
ফলে স্কিলড মাইগ্রেশনের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয় না।
অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশে গিয়ে তা স্বীকৃতি পান না। কারণ-
পূর্বে অর্জিত দক্ষতার সার্টিফিকেশন নেই
লাইসেন্সিং পরীক্ষায় বসার সুযোগ জটিল
নিয়োগকর্তারা স্থানীয় বা অন্য দেশের কর্মীকে অগ্রাধিকার দেয়
এতে করে স্কিলড হওয়ার প্রণোদনাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ সরকার স্কিলড মাইগ্রেশন নিয়ে নীতিগতভাবে অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তবে-
কোন খাতে কত স্কিলড কর্মী দরকার, এর ডাটাভিত্তিক পরিকল্পনা নেই
গন্তব্য দেশের সঙ্গে দক্ষতা স্বীকৃতি চুক্তি সীমিত
দূতাবাসগুলো স্কিল আপগ্রেড বা লাইসেন্সিং সহায়তায় দুর্বল
নীতির সঙ্গে বাস্তবতার এই ব্যবধানই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
বিশ্বব্যাপী কেয়ার ইকোনমি, হেলথ সেক্টর, গ্রিন এনার্জি ও ডিজিটাল সার্ভিসে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি এখনই-
টার্গেটেড স্কিল ডেভেলপমেন্ট
আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন
ভাষা প্রশিক্ষণ
রিক্রুটিং সংস্কার
এই চারটি জায়গায় জোর দেয়, তাহলে অদক্ষ শ্রমের দেশ থেকে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর সম্ভব।
অদক্ষ শ্রম থেকে স্কিলড মাইগ্রেশনে যাওয়া কোনো বিলাসিতা নয়- এটি টিকে থাকার শর্ত। প্রশ্নটি আর “আমরা কত মানুষ পাঠাচ্ছি” নয়;
প্রশ্নটি হলো- আমরা কেমন মানুষ পাঠাচ্ছি।
বাংলাদেশ যদি এই রূপান্তরে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে সে পিছিয়ে পড়বে। আর যদি সফল হয়, তাহলে প্রবাস শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নয়, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হবে।
সময় এখন সিদ্ধান্তের। দক্ষতা নয়তো অপ্রাসঙ্গিকতা, এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রবাসনীতি।