প্রবাস

অবৈধ হয়ে পড়া প্রবাসীদের গল্প: আইন ভাঙা নয়, বাঁচার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

তারা কেউ জন্মসূত্রে অপরাধী নয়, কেউ ইচ্ছা করেও আইন ভাঙতে বিদেশে পাড়ি জমায়নি। অধিকাংশই গিয়েছিল বৈধ কাগজ, বৈধ স্বপ্ন আর পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের আশায়। তবু সময়ের এক মোড়ে এসে তারা “অবৈধ” হয়ে গেছে, কোনো অপরাধ করে নয়, বরং বাঁচার তাগিদে।

প্রবাসে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের গল্প তাই আইনভঙ্গের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক শ্রমব্যবস্থার ব্যর্থতার গল্প।

অবৈধতা কীভাবে জন্ম নেয়?

অবৈধতা সাধারণত শুরু হয় একটি বৈধ পথ থেকেই।

  • কাজ হারানো, কিন্তু ভিসা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে বাঁধা

  • বেতন না পেয়ে চাকরি ছাড়লেও নতুন কাজের অনুমতি না পাওয়া

  • ভিসা নবায়নে মালিকের অবহেলা

  • নিয়োগকর্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া

  • চুক্তির শর্ত ভেঙে যাওয়ার পরও দেশে ফেরার সামর্থ্য না থাকা

এই প্রতিটি পরিস্থিতিতে প্রবাসী এক ধরনের আইনি শূন্যতায় পড়ে যায়। আইন তাকে বিকল্প পথ দেয় না, আর দেশে ফেরা মানে হয় ঋণ, লজ্জা ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া।

কফিল ও নিয়োগব্যবস্থা: অবৈধতার কাঠামোগত উৎস

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কফিল বা স্পনসরশিপভিত্তিক ব্যবস্থায় শ্রমিকের আইনি অবস্থান পুরোপুরি নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল। মালিক অসহযোগী হলে শ্রমিকের সামনে কার্যত তিনটি পথ থাকে-

১. বেতন ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়া

২. দেশে ফিরে সর্বস্ব হারানো

৩. অবৈধ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা

তৃতীয় পথটি তারা বেছে নেয় বাঁচার তাগিদে, অপরাধের আকাঙ্ক্ষায় নয়।

অবৈধ জীবনের নীরব শাস্তি

অবৈধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় অকথ্য শাস্তির অধ্যায়।

  • পুলিশের ভয়ে ঘরবন্দি জীবন

  • চিকিৎসা নিতে না পারা

  • মালিকের কাছে আরও শোষণের শিকার হওয়া

  • দুর্ঘটনায় পড়লেও সাহায্য না চাওয়ার ভয়

  • মৃত্যু হলেও পরিচয়হীন দাফনের আশঙ্কা

এটি আইনের শাস্তির চেয়েও ওক্তহ, কারণ এটি প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

নারী ও অবৈধতা: দ্বিগুণ ঝুঁকি

নারী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে অবৈধতার ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা অনেক নারী-

  • নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসে অবৈধ হয়ে পড়েন

  • পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়

  • অভিযোগ করলে ডিপোর্টেশনের ভয় দেখানো হয়

এখানে অবৈধতা অপরাধ নয়, বরং নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা।

রাষ্ট্র কোথায় ব্যর্থ?

প্রেরণকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দায় এখানেই শেষ হয়ে যায় না। কিন্তু বাস্তবে-

  • চুক্তি ও ভিসার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয় না

  • দূতাবাসের সহায়তা সীমিত

  • আইনি সহায়তা দুর্বল

  • রেগুলারাইজেশন বা সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা কম

ফলে অবৈধ প্রবাসীরা রাষ্ট্রহীনতার কাছাকাছি এক অবস্থায় পড়ে।

আইন বনাম মানবিকতা: দ্বন্দ্ব কোথায়?

আইন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জরুরি। কিন্তু যখন আইন বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তখন সেটিই মানবিক সংকট তৈরি করে।

অবৈধ প্রবাসীদের প্রশ্নটি তাই নৈতিক-

একজন মানুষ কি বেঁচে থাকার জন্য অপরাধী হয়ে যায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন আইন যদি শ্রমিকের বাস্তব ঝুঁকি ও ক্ষমতার ভারসাম্য বিবেচনায় না নেয়, তাহলে অবৈধতা অপরাধ নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত ফলাফল।

সমাধান কোথায়?

অবৈধতা কমাতে প্রয়োজন-

  • নিয়োগকর্তা-নির্ভর ভিসা ব্যবস্থা সংস্কার

  • চাকরি বদলের সুযোগ সহজ করা

  • দ্রুত ও কম খরচে ভিসা নবায়ন

  • দূতাবাসে আইনি সহায়তা জোরদার

  • সাধারণ ক্ষমা ও রেগুলারাইজেশন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় কূটনীতি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অবৈধ প্রবাসীদের অপরাধী হিসেবে নয়, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিক হিসেবে দেখা।

শেষ কথা

অবৈধ হয়ে পড়া প্রবাসীরা আইন ভাঙতে যায়নি। তারা আইন আর বাস্তবতার মাঝখানে আটকে গেছে। তাদের গল্প আসলে রাষ্ট্র, বাজার ও বৈশ্বিক শ্রমব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল।

বাঁচার তাগিদ কখনো অপরাধ হতে পারে না।

এই সত্য মেনে নিয়েই প্রবাসী নীতিকে নতুন করে ভাবতে হবে, না হলে অবৈধতার গল্প থামবে না, কেবল মুখ বদলাবে।