প্রবাস

ফেরত প্রবাসীর অভিজ্ঞতা কেন নীতিনির্ধারণে আসে না?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফেরা মানুষগুলো শুধু কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেরা শ্রমিক নন, তারা বহন করে নিয়ে আসেন একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। বিদেশের শ্রমবাজার, নিয়োগব্যবস্থা, শোষণ, দক্ষতা, সাফল্য ও ব্যর্থতার বাস্তব অভিজ্ঞতা, সবকিছু মিলিয়ে তারা হতে পারতেন নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র। অথচ বাস্তবতা হলো, ফেরত প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অভিবাসন নীতিনির্ধারণে প্রায় অদৃশ্য। কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেখতে হবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নীতির কাঠামো এবং ক্ষমতার সম্পর্ক, সব একসঙ্গে।

ফেরত প্রবাসী: নীতির চোখে ‘সমাপ্ত অধ্যায়’

নীতিনির্ধারণের ভাষায় প্রবাসী মানেই কর্মরত প্রবাসী, যিনি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তখন রাষ্ট্রীয় নজরে তিনি হয়ে যান “সমাপ্ত কেস”।

  • তিনি আর বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন না

  • পরিসংখ্যানের বাইরে চলে যাচ্ছেন

  • অভিবাসন নীতির লক্ষ্যগোষ্ঠী থেকে বাদ পড়ছেন

ফলে তার অভিজ্ঞতা আর রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে থাকে না।

ডাটার রাজনীতি: অভিজ্ঞতা বনাম সংখ্যা

রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সংখ্যা- কত জন গেল, কত টাকা এলো, কত রিজার্ভ বাড়ল। কিন্তু ফেরত প্রবাসীর অভিজ্ঞতা সংখ্যায় ধরা পড়ে না।

  • চুক্তি ভঙ্গের গল্প

  • বিমা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা

  • কফিল নির্ভরতার ঝুঁকি

  • রিক্রুটিং প্রতারণা

এসব ‘গুণগত তথ্য’ (qualitative data), যা সংগ্রহ করা কঠিন এবং বিশ্লেষণে সময় লাগে। ফলে নীতিনির্ধারকরা সহজ পথ বেছে নেন, সংখ্যা দিয়ে সিদ্ধান্ত।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি

বাংলাদেশে ফেরত প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য কোনো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই।

  • ফেরত আসার সময় কোনো বাধ্যতামূলক ডিব্রিফিং নেই

  • দূতাবাস ও প্রবাস কল্যাণ দপ্তরের তথ্য সংযোগ দুর্বল

  • গবেষণা সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নেই

ফলে প্রতিটি প্রবাসীর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে থাকে, নীতিগত শিক্ষা হয়ে ওঠে না।

ক্ষমতার বৈষম্য: কে কথা বলার সুযোগ পায়?

নীতিনির্ধারণে যারা কথা বলেন, তারা সাধারণত-

  • রিক্রুটিং ব্যবসার প্রতিনিধি

  • বড় ঠিকাদার

  • প্রশাসনিক এলিট

  • আন্তর্জাতিক সংস্থা

ফেরত প্রবাসীরা এই ক্ষমতার বলয়ের বাইরে। তারা সংগঠিত নন, লবিং শক্তি নেই, ভাষাগত ও নীতিগত পরিভাষায় দক্ষ নন। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় আলোচনার টেবিলে পৌঁছায় না।

ব্যর্থতার আয়না দেখতে অনীহা

ফেরত প্রবাসীদের গল্প অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আয়না হয়ে দাঁড়ায়-

  • অদক্ষ শ্রম রপ্তানির ফল

  • দুর্বল কূটনীতি

  • রিক্রুটিং ব্যবস্থার অনিয়ম

  • দূতাবাসের সীমাবদ্ধতা

এই বাস্তবতা স্বীকার করা মানে নীতিগত দায় স্বীকার করা। অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা এই অস্বস্তিকর আয়নার দিকে তাকাতে চান না।

পুনর্বাসন নীতি: আছে, কিন্তু শোনা নেই

ফেরত প্রবাসীদের জন্য কিছু পুনর্বাসন কর্মসূচি থাকলেও সেগুলো অনেক সময় উপরের স্তর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। প্রবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে প্রশ্ন খুব কমই উঠে আসে।

ফলে নীতি হয়-

  • বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন

  • প্রয়োজনভিত্তিক নয়

  • দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর

অভিজ্ঞতা থেকে নীতিতে যাওয়ার সম্ভাবনা কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরত প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা গেলে-

  • রিক্রুটিং ঝুঁকি কমানো যেত

  • স্কিলড মাইগ্রেশন বাস্তবসম্মত হতো

  • অবৈধতা কমানো যেত

  • দূতাবাস সেবা উন্নত করা যেত

অর্থাৎ অভিজ্ঞতা হতে পারত নীতির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।

করণীয়: অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদে রূপান্তর

এজন্য প্রয়োজন-

  • ফেরত প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক ডিব্রিফিং ব্যবস্থা

  • অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক ডাটাবেজ

  • নীতিনির্ধারণে ফেরত প্রবাসী প্রতিনিধিত্ব

  • গবেষণা ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়

  • প্রবাসী সংগঠনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- ফেরত প্রবাসীদের ভুক্তভোগী নয়, জ্ঞানসম্পদ হিসেবে দেখা।

শেষ কথা

ফেরত প্রবাসীরা ব্যর্থতার প্রতীক নন; তারা অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাদের গল্প উপেক্ষা করা মানে একই ভুল বারবার করা। একটি পরিপক্ব রাষ্ট্র তার নীতিনির্ধারণে কেবল সফলতার গল্প শোনে না, ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেয়।

প্রবাসনীতি তখনই মানবিক ও কার্যকর হবে, যখন মাঠের অভিজ্ঞতা নীতির ভাষায় রূপ নেবে।

ফেরত প্রবাসীদের কণ্ঠস্বর শোনা মানেই ভবিষ্যতের প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা।