প্রবাস

কানাডায় প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম ফেডারেল এমপি নির্বাচিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক ডলি বেগম দেশটির ফেডারেল রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। টরোন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকে লিবারেল পার্টির প্রার্থী হিসেবে উপনির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি এ ইতিহাস গড়েন। এই জয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি কানাডার সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

কানাডায় আজ স্থানীয় সময় সোমবার (১৩ এপ্রিল) তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আজকের এই উপনির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল লিবারেল পার্টি অব কানাডা সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে।

এই উপনির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে অন্টারিওর ইউনিভার্সিটি—রোসডেল ও স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট এবং কুইবেকের তেরেবোন আসনে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লিবারেলদের মাত্র একটি আসনে জয় প্রয়োজন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্য আজকের উপনির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তার সরকারের আইন পাস করা সহজ হবে এবং নীতিনির্ধারণে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এতে করে আগামী নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

আজকের উপনির্বাচনের আগে পর্যন্ত লিবারেলরা পার্লামেন্টে ১৭১টি আসন নিয়ে এগিয়ে ছিল। সম্প্রতি কনজারভেটিভ দলের এমপি মেরিলিন গ্লাডু দল পরিবর্তন করে লিবারেল দলে যোগ দেওয়ায় তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছিল। অন্যদিকে আজকের উপনির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগমের জয়ের মধ্য দিয়ে লিবারেল পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে লিবারেল পার্টির আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭৪টি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক ডলি বেগম এমপি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে দেশটির অন্টারিও প্রাদেশিক পার্লামেন্টে এমপিপি পদে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিলেন গত বছর। তখন তিনি টরন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।

এর আগে ডলি ২০১৮ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রথম এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। কানাডার তিন স্তরের সরকারব্যবস্থার কোনো আইনসভায় তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিউ ডেমোক্র্যাট।

চলতি বছরের শুরুতে দীর্ঘদিনের লিবারেল দুর্গ হিসেবে পরিচিত স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনটি সাবেক মন্ত্রী বিল ব্লেয়ারের বিদায়ের পর শূন্য হয়ে পড়লে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির হয়ে মনোনয়ন পান ডলি বেগম।

ডলি বেগম তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে লিবারেল দলে যোগ দেওয়ার কারণ হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দূরদর্শী নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি গত সাত বছর ধরে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের মানুষের জন্য লড়াই করেছি। তবে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমার মনে হয়েছে, আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কাজ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বে আমি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই।’

তিনি জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এবং কানাডাকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি প্রস্তুত।

ডলি বেগমের বাড়ি বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড়ে। বাবা রাজা মিয়া এবং মা জবা বেগমের হাত ধরে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি কানাডায় পাড়ি জমান। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে তিনি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) থেকে উন্নয়ন প্রশাসন ও পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

টরোন্টোপ্রবাসী বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব দেলোয়ার এলাহী বলেন, লিবারেল পার্টি ও প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সিদ্ধান্ত আবারও প্রমাণ করেছে—দল নয়, ব্যক্তির সততা, কর্মদক্ষতা, জনসংযোগ এবং বহুজাতিক, বহুবর্ণ ও বহুধর্মের কানাডার সমতার রাষ্ট্রীয় দর্শন ধারণ ও চর্চাকারী রাজনীতিবিদরাই মূলত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ডলি বেগম যে এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ডলি বেগমকে নিজ দলে টেনে এনে মূলত জয়ী হয়েছেন মার্ক কার্নিই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডার প্রাদেশিক রাজনীতি থেকে ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ডলি বেগমের পদার্পণ তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করবে। পাশাপাশি রাজনীতিতে তার এই সাফল্য বাংলাদেশিদের, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

অন্যদিকে কানাডার স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডলি বেগমকে অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ডলি বেগমের এই বিজয় তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন, ডলি বেগম তার কমিউনিটির উন্নয়নে দৃঢ়ভাবে এবং কার্যকরভাবে কাজ করে আসছেন।

কার্নি আরও বলেন, ডলি বেগমের অক্লান্ত কণ্ঠস্বর, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও আরও ন্যায্যভিত্তিক কানাডা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, ডলি বেগম দীর্ঘদিন ধরে স্কারবোরো এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।