স্বাস্থ্য

শৈত্যপ্রবাহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি

তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট ও মৃত্যুঝুঁকি-বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবছর শীত এলেই শৈত্যপ্রবাহ নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ঠান্ডা শুধু অস্বস্তির কারণ নয়; এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে সংক্রমণ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে দিনমজুর, পথশিশু, বস্তিবাসী ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি। তাই শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, দুটিই এখন জরুরি জনস্বাস্থ্য ইস্যু।

শীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেন দুর্বল হয়

ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে-

  • ঠান্ডায় নাক ও শ্বাসনালির রক্তপ্রবাহ কমে যায়, ফলে ভাইরাস সহজে আক্রমণ করতে পারে

  • সূর্যালোক কম পাওয়ায় ভিটামিন ডি ঘাটতি দেখা দেয়

  • শুষ্ক আবহাওয়ায় শ্বাসনালির প্রাকৃতিক সুরক্ষা নষ্ট হয়

  • পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ঘুমের অভাব প্রতিরোধক্ষমতা কমায়

এর ফল হিসেবে সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কোভিড-জাতীয় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

নিম্নআয়ের মানুষ কেন বেশি ঝুঁকিতে

শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সমাজের সব স্তরে সমান নয়। নিম্নআয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন কারণ-

  • পর্যাপ্ত গরম কাপড় ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব

  • অপুষ্টি ও অনিয়মিত খাবার

  • খোলা আকাশের নিচে বা ভেজা পরিবেশে কাজ করা

  • স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার

বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, কৃষিশ্রমিক ও পথবাসী মানুষের ক্ষেত্রে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা দ্রুত গুরুতর আকার ধারণ করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে করণীয়

শৈত্যপ্রবাহে সুস্থ থাকতে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

১. পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা

  • প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডাল, ডিম, মাছ)

  • মৌসুমি শাকসবজি ও ফল

  • ভিটামিন সি ও জিঙ্কসমৃদ্ধ খাদ্য

২. পর্যাপ্ত পানি পান

শীতেও শরীর ডিহাইড্রেট হতে পারে, এটি অনেকে বুঝতে পারেন না।

৩. নিয়মিত ঘুম ও বিশ্রাম

কম ঘুম সরাসরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৪. হালকা শারীরিক ব্যায়াম

ঠান্ডা থাকলেও শরীরচর্চা বন্ধ করা যাবে না।

৫. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা

হাত ধোয়া ও শ্বাসতন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখা সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা জরুরি

শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। দরকার সমন্বিত উদ্যোগ-

  • গরম কাপড় বিতরণ

  • আশ্রয়কেন্দ্র ও ওয়ার্ম শেল্টার

  • ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবা

  • স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা

এগুলো শুধু মানবিক সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি

শৈত্যপ্রবাহ একটি মৌসুমি দুর্যোগ, কিন্তু এর স্বাস্থ্যপ্রভাব প্রতিরোধযোগ্য।

প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে শীতকালীন অসুস্থতা ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

শৈত্যপ্রবাহে সুস্থ থাকা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এই দুইয়ের সমন্বয়ই পারে শীতকে নিরাপদ করে তুলতে।