স্বাস্থ্য

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কখন রোগে রূপ নেয়

স্বাভাবিক উদ্বেগ থেকে মানসিক ব্যাধির পথে যাত্রা দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, কাজকর্ম এমনকি শরীরকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। তখন স্বাভাবিক উদ্বেগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি মানসিক রোগে

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। পরীক্ষা, চাকরি, পরিবার, ভবিষ্যৎ, এসব নিয়ে ভাবনা না থাকলে মানুষকে দায়িত্বশীলই বলা যায় না। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই দুশ্চিন্তা আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না; যখন তা দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক, কাজকর্ম এমনকি শরীরকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। তখন স্বাভাবিক উদ্বেগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি মানসিক রোগে।

প্রশ্ন হলো- দুশ্চিন্তা আর রোগের মাঝখানের সেই সীমারেখা কোথায়?

দুশ্চিন্তা বনাম উদ্বেগজনিত রোগ

স্বাভাবিক দুশ্চিন্তা সাধারণত-

  • নির্দিষ্ট কোনো কারণকে কেন্দ্র করে হয়

  • পরিস্থিতি বদলালে কমে যায়

  • কাজকর্মে বড় বাধা সৃষ্টি করে না

কিন্তু উদ্বেগজনিত রোগে (Anxiety Disorder),

  • দুশ্চিন্তা হয় অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী

  • কারণ ছাড়াও ভয় বা আশঙ্কা কাজ করে

  • ঘুম, ক্ষুধা, কাজ, সম্পর্ক, সবকিছু ব্যাহত হয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন দুশ্চিন্তা ৬ মাস বা তার বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয় এবং জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে, তখন সেটিকে আর সাধারণ দুশ্চিন্তা বলা যায় না।

কখন সতর্ক হওয়ার সময় আসে

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা রোগে রূপ নেওয়ার কিছু স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে-

  • সারাক্ষণ অজানা ভয় বা অশান্তি

  • ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা

  • ছোট বিষয়েও চরম উৎকণ্ঠা

  • সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষমতা

  • সবসময় খারাপ কিছু ঘটবে, এই বিশ্বাস

এই লক্ষণগুলো যদি নিয়মিত ও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা মানসিক অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে।

শরীরেও দেখা দেয় দুশ্চিন্তার প্রভাব

মানসিক সমস্যা হলেও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার প্রভাব সবচেয়ে আগে পড়ে শরীরে। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে শারীরিক সমস্যার পেছনে মানসিক চাপ কাজ করছে।

সাধারণ শারীরিক উপসর্গগুলো হলো-

  • বুক ধড়ফড় করা

  • মাথা ঘোরা বা ভার লাগা

  • শ্বাস নিতে কষ্ট

  • ঘন ঘন মাথাব্যথা

  • পেটের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক

  • অতিরিক্ত ঘাম বা হাত কাঁপা

এই অবস্থায় অনেকে বারবার বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে যান, কিন্তু মূল কারণ থেকে যায় অচিহ্নিত।

ঘুম ও দুশ্চিন্তার বিপজ্জনক সম্পর্ক

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার অন্যতম বড় শিকার হলো ঘুম।

রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তার ঘূর্ণিপাক, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, বা ঘুম এলেও গভীর ঘুম না হওয়া, এসবই উদ্বেগজনিত রোগের সাধারণ লক্ষণ।

ঘুমের ঘাটতি আবার দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এভাবে তৈরি হয় একটি ভয়ংকর চক্র, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শুধু ব্যক্তির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে-

  • পারিবারিক সম্পর্কে

  • কর্মক্ষেত্রে

  • সামাজিক আচরণে

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ অনেক সময়-

  • সহজে বিরক্ত হন

  • নিজেকে গুটিয়ে নেন

  • অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন

ফলে একাকিত্ব বাড়ে, যা উদ্বেগকে আরও গভীর করে তোলে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

গবেষণা বলছে, কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে-

  • দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে থাকা মানুষ

  • কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় ভোগা ব্যক্তি

  • শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী

  • ট্রমা বা বড় ধাক্কা পেরিয়ে আসা মানুষ

  • যাদের পরিবারে মানসিক রোগের ইতিহাস আছে

বিশেষ করে বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

কখন দুশ্চিন্তা সরাসরি রোগে রূপ নেয়

দুশ্চিন্তা তখনই রোগে রূপ নেয়, যখন-

  • চিন্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়

  • ভয় বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত হয়

  • দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়

  • নিজের আচরণে পরিবর্তন আসে

  • শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দেয়

এই পর্যায়ে উপেক্ষা করলে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা: আশার জায়গা কোথায়

উদ্বেগজনিত রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

কার্যকর ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে-

  • মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

  • কাউন্সেলিং বা থেরাপি

  • প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ

  • নিয়মিত ঘুম ও জীবনযাপনের রুটিন

  • শারীরিক ব্যায়াম ও সামাজিক যোগাযোগ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমস্যাটিকে স্বীকার করা এবং সাহায্য চাইতে দ্বিধা না করা।

দুশ্চিন্তা মানুষকে সতর্ক করে, কিন্তু অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষকে অসুস্থ করে তোলে। সমাজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ও ভুল ধারণা আছে বলেই অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না।

মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগ দুর্বলতার লক্ষণ নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। সময়মতো চিহ্নিত ও সঠিকভাবে মোকাবিলা করা গেলে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাকে রোগে রূপ নেওয়ার আগেই থামানো সম্ভব।