স্বাস্থ্য

প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার রাখার স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রতিদিনের উপেক্ষিত নীরব বিপদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আধুনিক জীবনের গতি ও ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রান্নাঘরেও এসেছে পরিবর্তন। হালকা, সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় প্লাস্টিকের পাত্র আজ প্রায় প্রতিটি ঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাবার সংরক্ষণ, গরম করা কিংবা বাইরে বহনের কাজে আমরা নির্ভর করছি প্লাস্টিকের ওপর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই সুবিধার আড়ালে কি লুকিয়ে আছে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি?

প্লাস্টিকের রাসায়নিক বাস্তবতা

সব প্লাস্টিক একরকম নয়। খাবার সংরক্ষণে ব্যবহৃত অনেক প্লাস্টিক পাত্রেই থাকে বিসফেনল-এ (BPA), ফথালেটস ও অন্যান্য শিল্পজাত রাসায়নিক। এগুলো প্লাস্টিককে শক্ত, নমনীয় বা টেকসই করতে ব্যবহৃত হয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই রাসায়নিকগুলো খাবারের সঙ্গে মিশে শরীরে প্রবেশ করে।

বিশেষ করে গরম খাবার, তেলযুক্ত খাবার বা অম্লীয় খাবার (যেমন টমেটো, লেবু, ভিনেগারযুক্ত রান্না) প্লাস্টিকের পাত্রে রাখলে রাসায়নিক লিক হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

হরমোন ব্যবস্থায় মারাত্মক প্রভাব

বিসফেনল-এ ও ফথালেটসকে বলা হয় এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর, অর্থাৎ এগুলো শরীরের স্বাভাবিক হরমোন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। দীর্ঘদিন এসব রাসায়নিক গ্রহণের ফলে দেখা দিতে পারে-

  • থাইরয়েডের সমস্যা

  • নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত অনিয়ম ও বন্ধ্যাত্ব

  • পুরুষদের শুক্রাণুর মান হ্রাস

  • শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের আশঙ্কা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন প্লাস্টিকজাত রাসায়নিক শরীরে জমতে থাকলে স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার, এমনকি লিভার ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। যদিও এই প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু নীরবে ও ধীরে ধীরে শরীরের ক্ষতি করে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর

সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য- মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিকের পাত্রে বারবার খাবার রাখা, ধোয়া ও গরম করার ফলে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস এমনকি প্লাসেন্টাতেও শনাক্ত হয়েছে।

যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।

আমরা যেসব ভুল অভ্যাসে ঝুঁকি বাড়াই

  • মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করা

  • গরম ভাত বা তরকারি সরাসরি প্লাস্টিক বক্সে রাখা

  • পুরনো, আঁচড় ধরা বা বিবর্ণ প্লাস্টিক ব্যবহার করা

  • “BPA-free” লেখা থাকলেই পুরোপুরি নিরাপদ ধরে নেওয়া

নিরাপদ বিকল্প ও সচেতনতা

স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি-

  • কাঁচ, স্টিল বা সিরামিক পাত্র ব্যবহার করা

  • খাবার ঠান্ডা হলে তবেই সংরক্ষণ করা

  • মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা

  • শিশুদের খাবার প্লাস্টিকে না রাখা

  • ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরনো প্লাস্টিক পাত্র বাতিল করা

প্লাস্টিকের পাত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুবিধা এনে দিলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অসুস্থতা অনেক সময় হঠাৎ আসে না, নীরবে, ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধে। সচেতনতা ও ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা নিজেরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি।

স্বাস্থ্যবান জীবন গড়তে চাইলে রান্নাঘর থেকেই শুরু হোক সচেতনতার প্রথম পদক্ষেপ।