স্বাস্থ্য

রান্নাঘরের ধোঁয়ায় আক্রান্ত ফুসফুস: ঘরের ভেতরের নীরব ঘাতক

চুলার ধোঁয়ায় ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীদের ফুসফুস। অথচ এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনও পরিবার ও সমাজে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। আজ কথা বলবো এর ক্ষতি এবং প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে রান্নাঘর নারীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র। দিনে কয়েক ঘণ্টা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে রান্না করা, এটি দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে হয়, এই রান্নাঘরই অনেক নারীর জন্য ফুসফুসের নীরব বিপদে পরিণত হচ্ছে। কাঠ, কয়লা, খড়, এমনকি গ্যাসচুলার ধোঁয়াও দীর্ঘদিন শ্বাস নেওয়ার ফলে নারীদের শ্বাসতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি করছে, যার পরিণতি অনেক সময় ধরা পড়ে দেরিতে।

রান্নাঘরের ধোঁয়ায় কী থাকে

রান্নার সময় উৎপন্ন ধোঁয়ায় থাকে-

  • কার্বন মনোক্সাইড

  • নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড

  • সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5)

  • ফরমালডিহাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক

এই কণাগুলো খুব সহজেই ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ক্ষতি করে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

  • গ্রাম ও বস্তি এলাকার নারী

  • যেসব পরিবারে কাঠ, খড়, গোবর বা কয়লা ব্যবহার হয়

  • জানালাবিহীন বা অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত রান্নাঘর

  • প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রান্না করেন এমন গৃহিণী

  • শিশু সন্তানসহ রান্নাঘরে সময় কাটানো নারী

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান না করেও বহু নারী ক্রনিক ফুসফুস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শুধুমাত্র রান্নাঘরের ধোঁয়ার কারণে।

নারীদের ফুসফুসে কী ধরনের ক্ষতি হয়

১) দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট (COPD)

ধোঁয়ার সংস্পর্শে ফুসফুসের বায়ুথলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে-

  • হাঁটলেই শ্বাস নিতে কষ্ট

  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি

  • ক্লান্তি

২) হাঁপানি ও অ্যালার্জি

রান্নাঘরের ধোঁয়া হাঁপানি বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন করে অ্যালার্জির সমস্যা তৈরি করে।

৩) ফুসফুস সংক্রমণ

ধোঁয়ার কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

৪) ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি

বিশেষ করে কাঠ ও কয়লার ধোঁয়ায় দীর্ঘদিন থাকলে ধূমপান না করেও ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত।

যে  লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়

  • দীর্ঘদিনের কাশি

  • রান্নার সময় বা পরে শ্বাসকষ্ট

  • বুকে চাপ বা জ্বালাপোড়া

  • ঘন ঘন শ্বাসনালির সংক্রমণ

  • রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

গ্যাসচুলা কি নিরাপদ?

অনেকে মনে করেন গ্যাসচুলা ঝুঁকিমুক্ত। বাস্তবে-

  • গ্যাসচুলা থেকেও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়

  • বায়ু চলাচল না থাকলে ঝুঁকি থেকেই যায়

  • রান্নার সময় এক্সহস্ট ফ্যান না থাকলে ক্ষতি বাড়ে

অর্থাৎ, জ্বালানি বদলালেই সমস্যার সমাধান হয় না, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করাই মূল বিষয়।

প্রতিরোধ ও করণীয়: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

✔️ রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল

জানালা ও ভেন্টিলেশন বাধ্যতামূলক

এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার

✔️ নিরাপদ জ্বালানির ব্যবহার

কাঠ ও কয়লার বদলে গ্যাস বা উন্নত চুলা

উন্নত চুলা (Improved Cookstove) ব্যবহার

✔️ রান্নার সময় সচেতনতা

শিশুদের রান্নাঘরে কম রাখা

চুলার সামনে মুখ ঝুঁকিয়ে না রাখা

✔️ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

দীর্ঘদিন রান্না করা নারীদের ফুসফুস পরীক্ষা

শ্বাসকষ্ট বা কাশি হলে দেরি না করা

নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা

  • গ্রামাঞ্চলে উন্নত চুলা বিতরণ

  • নিরাপদ জ্বালানি সহজলভ্য করা

  • নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে গণসচেতনতা

  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফুসফুস পরীক্ষা সুবিধা

রান্নাঘরের ধোঁয়াকে কেবল গৃহস্থালি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু।

উপসংহার

রান্নাঘরের ধোঁয়া কোনো সামান্য অস্বস্তি নয়, এটি নারীদের ফুসফুসের জন্য একটি নীরব ঘাতক। ঘরের ভেতরের এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হাজারো নারী শ্বাসকষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকে রক্ষা পাবেন। স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘর নিশ্চিত করা মানে শুধু ঘর পরিষ্কার রাখা নয়.

এটি নারীর জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।