হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিসকে সাধারণত বয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক মেয়ের ক্ষেত্রে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া শুরু হয় কৈশোর বা তারুণ্যেই। এর পেছনে রয়েছে পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনজনিত পরিবর্তন, জীবনযাপনের ভুল অভ্যাস এবং সামাজিক বাস্তবতা। একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলা যায়, এই নীরব সমস্যা সময়মতো শনাক্ত না হলে ভবিষ্যতে মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করে।
হাড় একটি জীবন্ত টিস্যু। নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত হাড় গঠন শক্তিশালী হয়, এরপর ধীরে ধীরে ক্ষয় শুরু হয়।
মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রায় ২৫-৩০ বছর বয়সেই সর্বোচ্চ হাড়ঘনত্ব (Peak Bone Mass) অর্জিত হয়। এই সময়ের আগেই যদি পুষ্টি ও জীবনযাপনে ঘাটতি থাকে, তবে হাড় কখনোই যথেষ্ট শক্ত হতে পারে না।
১. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ঘাটতি
অনেক মেয়েই দৈনন্দিন খাবারে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম পান না।
সূর্যালোক এড়িয়ে চলার কারণে ভিটামিন ডি ঘাটতি আরও বেড়ে যায়, যা ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা সৃষ্টি করে।
২. হরমোনজনিত সমস্যা
অনিয়মিত মাসিক
পিসিওএস (PCOS)
থাইরয়েড সমস্যা
এসব কারণে এস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা হাড় রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. অতিরিক্ত ডায়েটিং ও কম ওজন
অল্প বয়সে ওজন কমানোর প্রবণতা-
শরীরের ফ্যাট কমিয়ে দেয়
হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত করে
হাড় দুর্বল করে
বিশেষ করে খুব কম BMI হাড় ক্ষয়ের বড় ঝুঁকি।
৪. শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব
ওয়েট-বিয়ারিং এক্সারসাইজ (হাঁটা, দৌড়, স্কোয়াট) না করলে হাড় প্রয়োজনীয় চাপ পায় না, ফলে শক্তি কমে।
৫. জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস
অতিরিক্ত ক্যাফেইন
ধূমপান (সরাসরি বা পরোক্ষ)
দীর্ঘদিন স্টেরয়েড বা কিছু ওষুধ ব্যবহার
এসবই হাড় ক্ষয় ত্বরান্বিত করে।
কৈশোর ও তরুণ বয়সী মেয়েরা
গর্ভধারণ ও বুকের দুধ খাওয়ানো শেষে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া নারী
অল্প বয়সে মেনোপজ হওয়া নারী
পারিবারিকভাবে হাড় ক্ষয়ের ইতিহাস থাকলে
হাড় ক্ষয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না।
পরবর্তীতে দেখা দিতে পারে-
কোমর বা পিঠে ব্যথা
সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া
উচ্চতা কমে যাওয়া
✔️ সঠিক খাদ্যাভ্যাস
দুধ, দই, ছোট মাছ, শাকসবজি
ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
✔️ সূর্যালোক গ্রহণ
প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সকালের রোদে থাকা জরুরি।
✔️ নিয়মিত ব্যায়াম
ওয়েট-বিয়ারিং ও শক্তিবর্ধক ব্যায়াম হাড় মজবুত করে।
✔️ স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ঝুঁকিতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে বোন ডেনসিটি টেস্ট।
স্বাস্থ্য বিশেষঙ্গরা ব্যক্ত করেন- হাড় ক্ষয় কোনো হঠাৎ হওয়া রোগ নয়, এটি বছরের পর বছর জমে ওঠা অবহেলার ফল। মেয়েদের ক্ষেত্রে কৈশোর থেকেই সচেতনতা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মেয়েদের হাড়ের স্বাস্থ্য মানেই ভবিষ্যতের কর্মক্ষমতা ও জীবনমান। অল্প বয়সেই সঠিক পুষ্টি, ব্যায়াম ও সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে হাড় ক্ষয়কে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এখনই সময়, ভাঙনের আগে প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার।