স্বাস্থ্য

ফাস্টিং ট্রেন্ড: কার জন্য নিরাপদ, কার জন্য নয়

ওজন কমানো থেকে ‘ডিটক্স’, ফাস্টিং এখন জনপ্রিয় জীবনধারা। কিন্তু এই ট্রেন্ড কি সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ?

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, ১৬:৮ ডায়েট, ওয়ান মিল এ ডে (OMAD)-সোশ্যাল মিডিয়া ও লাইফস্টাইল ব্লগে এখন একটি আলোচিত স্বাস্থ্যচর্চা।

অনেকেই এটিকে দ্রুত ওজন কমানোর বা শরীর ‘রিসেট’ করার উপায় হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ফাস্টিং কোনো ম্যাজিক সমাধান নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগ-ব্যাধি ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী এটি কারও জন্য উপকারী হলেও কারও জন্য হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।

ফাস্টিং বলতে কী বোঝায়

ফাস্টিং হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। প্রচলিত কয়েকটি ধরন হলো-

  • ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (১৬:৮ বা ১৪:১০)

  • ২৪ ঘণ্টার ফাস্ট (সপ্তাহে ১-২ দিন)

  • OMAD (দিনে একবার খাবার)

এই সময়গুলোতে শরীর জমে থাকা শক্তি ব্যবহার করে এবং বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে।

ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য উপকারিতা

✔️ ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

নিয়ন্ত্রিত ফাস্টিং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করে।

✔️ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ফাস্টিং পদ্ধতি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

✔️ বিপাকীয় বিশ্রাম

নিরবচ্ছিন্ন খাবার গ্রহণের অভ্যাস থেকে শরীর সাময়িক বিশ্রাম পায়।

তবে এই উপকারিতা সবাইয়ের ক্ষেত্রে সমান নয়, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কার জন্য ফাস্টিং তুলনামূলক নিরাপদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফাস্টিং করতে পারেন-

  • সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৬০ বছর)

  • যাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ নেই

  • যাদের রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা স্বাভাবিক

  • যারা নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন

এদের ক্ষেত্রেও মাঝারি ও নিয়ন্ত্রিত ফাস্টিং বেশি নিরাপদ।

কার জন্য ফাস্টিং নিরাপদ নয়

❌ ডায়াবেটিস রোগী

বিশেষ করে ইনসুলিন বা ওষুধনির্ভর ডায়াবেটিসে-

  • হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে

  • রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যেতে পারে

❌ গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা

এই সময়ে অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন হয়। ফাস্টিং-

  • ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে

  • মায়ের দুর্বলতা বাড়ায়

❌ কিশোর–কিশোরী

শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সময় খাবার সীমিত করা-

  • হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে

  • বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে

❌ গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে-

  • অ্যাসিডিটি

  • পেটব্যথা

  • মাথা ঘোরা বাড়তে পারে

❌ খাওয়ার বিকার (Eating Disorder) ইতিহাস থাকলে

ফাস্টিং এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ফাস্টিংয়ে সাধারণ ভুলগুলো

  • হঠাৎ দীর্ঘ সময় ফাস্ট শুরু করা

  • ফাস্ট ভাঙার সময় অতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার

  • পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি

  • শরীরের সংকেত উপেক্ষা করা

নিরাপদ ফাস্টিংয়ের কিছু নির্দেশনা

✔️ ধীরে শুরু করুন

প্রথমে ১২–১৪ ঘণ্টা দিয়ে শুরু করা নিরাপদ।

✔️ পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন

ফাস্ট ভাঙার সময়-

প্রোটিন

শাকসবজি

স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি

✔️ পর্যাপ্ত পানি পান

ডিহাইড্রেশন এড়াতে নিয়মিত পানি জরুরি।

✔️ শরীরের কথা শুনুন

দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি হলে ফাস্ট বন্ধ করুন।

বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি

ফাস্টিং কোনো ‘ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল’ সমাধান নয়।

এটি একটি ব্যক্তিভেদে মানানসই বা ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস। সঠিক তথ্য ও পেশাদার পরামর্শ ছাড়া শুধু ট্রেন্ড অনুসরণ করা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।


ফাস্টিং হতে পারে জীবনযাপনের একটি অংশ- কিন্তু সেটি হতে হবে সচেতন, সীমিত ও শরীরবান্ধব।

সুস্থ থাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ এখনো হলো- সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম। ট্রেন্ড নয়, বরং নিজের শরীরকে বোঝাই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যচর্চার মূল ভিত্তি।