স্বাস্থ্য

অনলাইন গেমিং: ডিজিটাল আনন্দের আড়ালে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি

মোবাইল ও অনলাইন গেমে ডুবে থাকা শৈশব কি ধীরে ধীরে শিশুদের শরীরকে নিস্ক্রিয় করে দিচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখন শুধু অভ্যাস নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় অনলাইন গেমিং আজ শিশুদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। পড়াশোনার ফাঁকে, ঘুমের আগে কিংবা পুরো ছুটির দিন জুড়ে, স্ক্রিনে চোখ রেখে বসে থাকা এখন অনেক শিশুর দৈনন্দিন রুটিন।

একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে হয়, অতিরিক্ত অনলাইন গেমিং শিশুদের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে তাদের শরীর, মন ও সামাজিক বিকাশে।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বলতে কী বোঝায়

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বলতে বোঝায়-

  • পর্যাপ্ত দৌড়ঝাঁপ ও শরীরচর্চার অভাব

  • দীর্ঘ সময় বসে থাকা

  • শক্তি ব্যয় হয় এমন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ না করা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র শারীরিক কার্যক্রম প্রয়োজন।

অনলাইন গেমিং কীভাবে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ায়

১) দীর্ঘ সময় বসে থাকা

অনলাইন গেমে একটানা মনোযোগ থাকার ফলে শিশু-

  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে

  • দেহের বড় পেশিগুলো নিষ্ক্রিয় থাকে

২) খেলাধুলার জায়গা দখল করছে স্ক্রিন

আগের মাঠের খেলাধুলার জায়গা দখল করেছে-

  • মোবাইল গেম

  • অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেম

ফলে দৌড়, লাফ, সাইক্লিংয়ের মতো স্বাভাবিক কার্যকলাপ কমে যাচ্ছে।

৩) ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে ব্যাঘাত

অতিরিক্ত গেমিং-

  • ঘুমের সময় কমিয়ে দেয়

  • ক্লান্তি বাড়ায়

দিনের বেলা শারীরিক আগ্রহ কমিয়ে দেয়

শিশুদের শরীরে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব

➤ স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধি

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ যুক্ত হয়ে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

➤ হাড় ও পেশির দুর্বলতা

দৌড়ঝাঁপ না থাকলে-

  • হাড়ের ঘনত্ব কমে

  • পেশির শক্তি দুর্বল হয়

➤ দৃষ্টিশক্তি ও ভঙ্গি সমস্যা

দীর্ঘ স্ক্রিন টাইমের কারণে-

  • চোখে চাপ পড়ে

  • ঘাড় ও পিঠে ব্যথা

  • ভুল ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস তৈরি হয়

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়-

  • সামাজিক মেলামেশা কমে

  • একাকিত্ব বাড়ে

  • রাগ, উদ্বেগ ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়

  • অনেক ক্ষেত্রে গেমিং আসক্তির ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বাবা–মায়ের ভূমিকা ও সাধারণ ভুল

সাধারণ ভুল

  • গেমিংকে পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার

  • সময়সীমা নির্ধারণ না করা

  • নিজেরাও অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার

যা করা উচিত

  • দৈনিক স্ক্রিন টাইমের সীমা নির্ধারণ

  • পরিবারভিত্তিক শারীরিক কার্যক্রম

  • খেলাধুলাকে উৎসাহ দেওয়া

সুস্থ ভারসাম্য গড়ে তোলার উপায়

✔️ নির্দিষ্ট রুটিন

পড়াশোনা, গেমিং ও খেলাধুলার সময় ভাগ করা

✔️ বিকল্প কার্যক্রম

সাইক্লিং

সাঁতার

দৌড় বা ইনডোর ফিজিক্যাল গেম

✔️ স্কুল ও সমাজের ভূমিকা

নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম

মাঠ ও খেলার জায়গা নিশ্চিত করা

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

অনলাইন গেম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে-

  • বয়স অনুযায়ী গেম নির্বাচন

  • সময় নিয়ন্ত্রণ

  • শারীরিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক

এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

উপসংহার

অনলাইন গেমিং আধুনিক শৈশবের বাস্তবতা। কিন্তু ভারসাম্য না থাকলে এটি শিশুদের শরীরকে নিস্ক্রিয় করে দিতে পারে। সুস্থ শৈশব গড়ে তুলতে হলে স্ক্রিনের বাইরে শিশুদের দৌড়ানোর, খেলাধুলা করার ও প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।