ইউক্রেনে প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য কোনো শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূখণ্ডগত বিরোধ—বিশেষ করে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এক শীর্ষ সহকারী জানিয়েছেন, এই ইস্যুতে অগ্রগতি ছাড়া যুদ্ধবিরতির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রুশ ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের পর ক্রেমলিনের ওই কর্মকর্তা বলেন, “ভূখণ্ডগত প্রশ্নের সমাধান ছাড়া কোনো চুক্তি টেকসই হবে না।” তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ডনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আবুধাবিতে শুক্রবার ও শনিবার ডনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। ডনবাসের অন্তর্ভুক্ত দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল যুদ্ধের শুরু থেকেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমানে লুহানস্কের প্রায় পুরো অংশ এবং দোনেৎস্কের বড় একটি অংশ রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দোনেৎস্কের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা এখনো ইউক্রেনীয় বাহিনীর দখলে রয়েছে, যা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনকে দোনেৎস্কের অবশিষ্ট অংশ থেকেও সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। পুতিনের মতে, এই অঞ্চল রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক ভূমি’ এবং ২০২২ সালে একতরফা গণভোটের মাধ্যমে এটিকে রাশিয়ার অংশ ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি দোনেৎস্কের এক ইঞ্চি ভূমিও ছাড়তে রাজি নন। তার মতে, এই অঞ্চল ছেড়ে দেওয়া মানে ভবিষ্যতে রাশিয়ার জন্য ইউক্রেনের গভীরে নতুন করে হামলার পথ খুলে দেওয়া।
দোনেৎস্কের ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত অংশে অবস্থিত স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক শহরকে কিয়েভ ‘দুর্গ নগরী’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এসব এলাকায় পরিখা, বাঙ্কার, ট্যাংকবিরোধী প্রতিরক্ষা ও মাইনফিল্ড স্থাপন করা হয়েছে।
ইউক্রেনের আশঙ্কা, দোনেৎস্ক পুরোপুরি হারালে রাশিয়ার জন্য দনিপ্রো নদীর পূর্ব তীর ধরে পশ্চিম ইউক্রেনে অগ্রসর হওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যাবে।
যুদ্ধের আগে দোনেৎস্ক ছিল ইউক্রেনের অন্যতম শিল্পাঞ্চল। কয়লা, স্টিল, কাস্ট আয়রন ও ভারী শিল্পে অঞ্চলটি দেশের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন জোগান দিত। এছাড়া এখানে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় রাজস্বের উৎস হতে পারে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও দোনেৎস্ক দুই নেতার জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল। পুতিন এই অঞ্চলকে রাশিয়ার জাতিগত রুশ জনগোষ্ঠী রক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখান। অন্যদিকে, জেলেনস্কির রাজনৈতিক পরিচিতির কেন্দ্রে রয়েছে বড় শক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
ওয়াশিংটনের একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ডনবাসকে নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের ধারণা আলোচনায় এসেছে। তবে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ চুক্তির আওতায় দোনেৎস্কে নিয়মিত সেনার বদলে রাশিয়ার ন্যাশনাল গার্ড বা পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তবে কিয়েভের কাছে এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, ভূখণ্ডগত কোনো পরিবর্তন করতে হলে গণভোট বাধ্যতামূলক। এজন্য অন্তত ৩০ লাখ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এই আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভূমি ছাড় দেওয়ার কোনো এখতিয়ার তার নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এই অবস্থানের সমালোচনা করে বলেছেন, “কিছু ভূমি বিনিময় হবেই”—যা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দোনেৎস্ক প্রশ্নে সমঝোতা না হলে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। উভয় পক্ষই এই অঞ্চলকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অপরিহার্য মনে করছে। ফলে শান্তি আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—দোনেৎস্কই ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন গিঁট।
সূত্র: রয়টার্স