জেফ্রি এপস্টিনের নাম আজ আর কেবল একজন অভিযুক্ত যৌন অপরাধীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক নথিভাণ্ডার, যা আধুনিক সময়ের বিচারব্যবস্থা, ক্ষমতার রাজনীতি এবং নৈতিকতার সীমারেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ‘এপস্টিন ফাইলস’ আসলে একটি মামলার দলিল নয়; এটি একটি ব্যবস্থার চরিত্র উন্মোচনের দলিল।
এই ফাইলস বলতে বোঝানো হয় এপস্টিনকে ঘিরে তৈরি হওয়া আদালতের নথি, তদন্ত সংক্রান্ত দলিল, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, ফ্লাইট লগ, আর্থিক ও যোগাযোগের রেকর্ড, যার বড় অংশ বছরের পর বছর জনসম্মুখে আসেনি। এসব নথি দীর্ঘদিন সিল করে রাখা হয়েছিল, এবং সেগুলো প্রকাশ পেতেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে: এতদিন কী লুকানো ছিল, আর কেন?
এপস্টিনের উত্থান নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি অর্থের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন সম্পর্ককে। রাজনীতি, কর্পোরেট জগৎ, একাডেমিয়া এবং আন্তর্জাতিক অভিজাত সমাজের সঙ্গে তার অবাধ যাতায়াত তাকে এমন এক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে দেয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য আইনি ঝুঁকি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই বলয় ভাঙতে বিচারব্যবস্থারই সময় লেগেছে প্রায় দুই দশক।
২০০৮ সালে হওয়া বিতর্কিত সমঝোতা এই কেসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়। গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এপস্টিন যে হালকা শাস্তি পান, তা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। অনেক ভুক্তভোগী তখন জানতেই পারেননি, তাদের অভিযোগের পরিণতি কী হয়েছে। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, ক্ষমতা ও প্রভাব থাকলে বিচার কতটা নমনীয় হয়ে উঠতে পারে।
পরবর্তীতে যখন এপস্টিন ফাইলস ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় বিভিন্ন পরিচিত নাম। এখানে সাংবাদিকতার দায়িত্বশীল অবস্থান জরুরি হয়ে ওঠে।
কারণ নথিতে কারও নাম থাকা মানেই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ নয়। অনেক নাম এসেছে সাক্ষ্যের সূত্রে, অনেক এসেছে সামাজিক বা পেশাগত যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, এসব নাম এপস্টিনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের গভীরতা অস্বীকার করার সুযোগ রাখে না।
সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ নিয়ে। জনমনে একটি নির্দিষ্ট তালিকার ধারণা তৈরি হলেও, আইনি বাস্তবতায় এমন কোনো প্রামাণ্য তালিকা আজও নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
তবে তদন্তের সীমাবদ্ধতা, অসম্পূর্ণ সাক্ষ্য এবং বিচার প্রক্রিয়ার আগেই কেস থেমে যাওয়ায় এই প্রশ্ন চূড়ান্ত উত্তর পায়নি।
২০১৯ সালে এপস্টিনের গ্রেপ্তার অনেকের কাছে মনে হয়েছিল ন্যায়বিচারের সূচনা। কিন্তু সেই আশাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারাগারে তার মৃত্যু কেবল একটি মানবিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি ছিল পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার হঠাৎ সমাপ্তি। এই মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সম্ভাব্য সাক্ষ্য, দায় নির্ধারণ এবং আরও গভীর অনুসন্ধানের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও নজরদারির ঘাটতি এই মৃত্যুকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে সিল করা কিছু নথি প্রকাশ পেলেও, সেগুলো নতুন অপরাধ উদ্ঘাটনের চেয়ে বেশি করে প্রকাশ করেছে একটি ব্যবস্থার দুর্বলতা। এই নথিগুলো দেখিয়েছে, কীভাবে তদন্ত সীমিত রাখা হয়েছে, কীভাবে চাপ ও প্রভাব বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, এবং কীভাবে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথ দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে।
এপস্টিন ফাইলস ঘিরে গণমাধ্যমের ভূমিকা তাই দ্বিমুখী। একদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এই অন্ধকার অধ্যায়কে সামনে এনেছে, অন্যদিকে অতিরঞ্জন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রকৃত সত্যকে আড়ালও করেছে। ফলে সাধারণ পাঠকের কাছে এপস্টিন ফাইলস অনেক সময় সত্যের চেয়ে ধোঁয়াশাই বেশি তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, এপস্টিন ফাইলস আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি দেখায়, ক্ষমতা ও অর্থ কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ধীর করে দিতে পারে, কীভাবে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ চাপা পড়ে, এবং কীভাবে ন্যায়বিচার কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ আপসের শিকার হয়।
এই ফাইলস কোনো গুজবের সংকলন নয়, আবার পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের দলিলও নয়। এটি একটি অসমাপ্ত আর্কাইভ, যা ভবিষ্যতের জন্য রেখে গেছে একটাই মৌলিক প্রশ্ন:
ক্ষমতার মুখোমুখি হলে, আইন কি সত্যিই সমান থাকে?