আবারও তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে ‘একীভূত’ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি বলেছেন, চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের পুনর্মিলন অনিবার্য। এটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। দ্বীপ দেশটি ঘিরে দুইদিনব্যাপী সামরিক মহড়া শেষ হওয়ার একদিন পর বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) খ্রিস্টীয় নববর্ষের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
বেইজিং বরাবরই স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবির পাশাপাশি ‘প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার’ করে দ্বীপ দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। অন্যদিকে তাইপে ১৯৪৯ সাল থেকে নিজেদের স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছে।
গত সোম ও মঙ্গলবার তাইওয়ানকে ঘিরে ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামে ব্যাপক সামরিক মহড়া চালায় চীনা সামরিক বাহিনী। ওই মহড়ায় চীন অন্তত ২০০টি যুদ্ধবিমান এবং কয়েক ডজন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে তাইওয়ানকে কার্যত ঘিরে করে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, মহড়া চলাকালে চীন অন্তত ২৭টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার বেশ কয়েকটি দ্বীপটির উপকূল থেকে মাত্র ২৭ নটিক্যাল মাইল দূরে আঘাত হানে। যদিও মহড়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে, তবে তাইওয়ান এখনও উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানেও দ্বীপটির চারপাশে চীনের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ২৫টি জাহাজ অবস্থান করছে এবং নজরদারি চালানোর জন্য চীন বিশেষ বেলুন পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রির অনুমোদনের জবাবে চীন এই রণপ্রস্তুতি প্রদর্শন করেছে।
তাইওয়ান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গেও চীনের উত্তেজনা বাড়ছে। জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সানা তাকাইচি তাইওয়ান ইস্যু যুদ্ধের দিকে গেলে সামরিক পদক্ষেপে ইঙ্গিত দেন। তার বক্তব্যের পর এশিয়ার বৃহৎ দুই অর্থনীতির মধ্যে বৈরিতা দেখা দিয়েছে। আর তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলেছে।
মহড়া শেষ হওয়ার পরই নববর্ষের ভাষণে তাইওয়ান দখলের সারসরি হুঙ্কার দিলেন চীনা প্রেসিডেন্ট। শি জিনপিং আরও বলেন, আজকের বিশ্ব পরিবর্তন ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু অঞ্চলে এখনও যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। চীন সবসময় ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়ায়। আমরা বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়ন এগিয়ে নিতে এবং মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সব দেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’
চীনা প্রেসিডেন্টের ভাষণের সময় চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত দেশটির বৃহত্তম সামরিক কুচকাওয়াজের প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হয়, যেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন উপস্থিত ছিলেন।
পশ্চিমা বিশ্লেষকরা চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতাকে ‘অ্যাক্সিস অব আপহিবল’ বা ‘উত্থানের অক্ষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তাদের আশঙ্কা, শি জিনপিংয়ের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই চীনা সেনারা যেকোনো মুহূর্তে তাইওয়ানে আক্রমণ চালাতে পারে।
এদিকে চীনের এই আধিপত্যবাদী আচরণের কড়া জবাব দিয়েছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। নববর্ষের ভাষণে তিনি চীনের ‘আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়ে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ নিয়েছেন। একইসঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এবং প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাব পাসে পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলোকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান