আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ উত্তেজনা: লেবানন কি পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র?

নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্য যখন একের পর এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ সীমান্ত উত্তেজনা ক্রমেই একটি বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। গাজা যুদ্ধের প্রভাব, আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাস এবং প্রতিশোধমূলক রাজনীতির আবহে লেবানন আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল হিসাব পুরো অঞ্চলকে নতুন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রশ্নটি আর কেবল তাত্ত্বিক নয়, লেবানন কি সত্যিই পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে?

উত্তেজনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৮০- এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর উত্থান ঘটে। সময়ের সঙ্গে সংগঠনটি শুধু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং লেবাননের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতর শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।

২০০৬ সালের যুদ্ধ ছিল এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রকাশ। সেই যুদ্ধের পর উভয় পক্ষই বুঝেছে, পূর্ণমাত্রার সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সেটিই আবার বর্তমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ কেউই প্রকাশ্যে যুদ্ধ চায় না, অথচ কেউই পিছু হটতেও প্রস্তুত নয়।

বর্তমান উত্তেজনার নতুন মাত্রা

গাজায় চলমান সংঘাত ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সম্পর্ককে নতুনভাবে উত্তপ্ত করেছে। সীমান্তে পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। যদিও এসব হামলা এখনো সীমিত পরিসরে রাখা হচ্ছে, তবু প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতের মাত্রা এক ধাপ করে বাড়ছে।

এই ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ ইতিহাস বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা সীমিত সংঘাত হঠাৎ করেই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, বিশেষ করে যখন আবেগ, প্রতিশোধ ও আঞ্চলিক চাপ একত্রিত হয়।

হিজবুল্লাহর কৌশল ও সীমাবদ্ধতা

হিজবুল্লাহ নিজেকে কেবল লেবাননের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তির অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে।

তবে বাস্তবতা হলো, হিজবুল্লাহও জানে একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ লেবাননের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত, রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর একটি দেশ নতুন যুদ্ধ বহন করতে পারবে না। ফলে হিজবুল্লাহ একদিকে শক্তির প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে এমন সীমা অতিক্রম করছে না, যা সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ ডেকে আনবে।

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব

ইসরায়েলের দৃষ্টিতে হিজবুল্লাহ হলো উত্তর সীমান্তের সবচেয়ে বড় হুমকি। গাজা ও পশ্চিম তীরে যখন চাপ বাড়ছে, তখন উত্তর সীমান্তে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি।

তবু ইসরায়েলও একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়, হিজবুল্লাহ যদি লাল রেখা অতিক্রম করে, তাহলে জবাব হবে কঠোর ও ব্যাপক। এই কৌশলগত দ্বন্দ্ব,আতঙ্ক সৃষ্টি কিন্তু যুদ্ধ এড়িয়ে চলা বর্তমান পরিস্থিতিকে এক ধরনের অস্থির ভারসাম্যে আটকে রেখেছে।

লেবানন: সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ

এই সমীকরণে সবচেয়ে অসহায় অবস্থানে রয়েছে লেবানন রাষ্ট্র নিজেই। অর্থনৈতিক ধস, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সামাজিক বিভাজনের মধ্যে দেশটি কার্যত দুর্বল। সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষে হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা বাস্তবসম্মত নয়।

যুদ্ধ শুরু হলে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে লেবাননের সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকেই ইতোমধ্যে দারিদ্র্য, বিদ্যুৎ সংকট ও বেকারত্বে জর্জরিত।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ কেবল দ্বিপাক্ষিক থাকবে না। ইরান, সিরিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো নিরাপত্তা কাঠামো নড়বড়ে হয়ে উঠবে।

বিশ্ব শক্তিগুলোর জন্যও এটি একটি দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি, কারণ একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও কূটনীতিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

যুদ্ধ কি অনিবার্য?

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর হলো- যুদ্ধ অনিবার্য নয়, কিন্তু ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেশি। যত দিন গাজা সংকট চলবে, তত দিন ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ উত্তেজনাও উচ্চমাত্রায় থাকবে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ভুল হিসাব। একটি বড় হামলা, ভুল লক্ষ্যবস্তু বা আবেগঘন সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

শেষ কথা

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ উত্তেজনা আসলে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি শক্তি নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায়, কিন্তু কেউই যুদ্ধের পরিণতি বহন করতে প্রস্তুত নয়।

লেবানন এখন সেই আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে বিস্ফোরণ এখনো হয়নি, কিন্তু ধোঁয়া স্পষ্ট।

প্রশ্ন তাই আর এই নয় যে উত্তেজনা আছে কি না।

প্রশ্ন হলো, কূটনীতি কি শেষ পর্যন্ত এই আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, নাকি লেবানন আবারও ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর অধ্যায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।